,

Notice :

পর্যটন : রূপ দেখাচ্ছে টাঙ্গুয়া

শামস শামীম ::
দিগন্ত বিস্তৃত নীলজল আর মেঘালয়ের মেঘময় সবুজ পাহাড় দেখে কেউ গাচ্ছেন ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই’; কেউবা হাওরের স্বচ্ছতোয়া নীলঢেউ জলে ভেসে উজালা রাতে বসে কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন ‘এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজে যায় এসোনা গল্প করি’ অথবা আরো আরো কেউ হিজল করচের ডুবুডুবু বাগের গহীনে হারিয়ে গাইছেন রবি ঠাকুরের ‘এই জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে…’ সহ প্রকৃতিবন্ধনার নানা গান। কারো কণ্ঠে বিরহের গান-কবিতা কারোবা কণ্ঠে মিলনের সুর। সময়ের যাঁতাকলে আটকে থাকা নাগরিক মন একটু ফুসরত পেলেই প্রকৃতির টানে দিচ্ছে একপসলা ছুট…। দেহ মনে লেপ্টে থাকা নাগরিক ধুলো শান্ত নীলজলে অবগাহন করে হরিৎ ধুয়ে মুছে দারুণ প্রশান্তি খুঁজছে মানুষ! সম্প্রতি সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের দিকে ছুটে আসা পর্যটকদের মিছিল এসব বার্তাই দিচ্ছে জেলাবাসীকে। পর্যটক টানতে সরকারি বেসরকারিভাবে পর্যটক বান্ধব অবকাঠামোর দিকে জোর দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন তারা।

গত কয়েক বছর ধরে টাঙ্গুয়ার হাওর, ট্যাকেরঘাটে শহীদ সিরাজ লেক, লাকমাছড়া, যাদুকাটা নদী, বড়গোপ টিলা (বারেকের টিলা), জয়নাল আবেদীনের শিমুল বাগানে ছুটির দিনগুলোতে পর্যটকদের আনাগোনা বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্গম ও বিড়ম্বিত যোগাযোগ মাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মেঘালয়ের নীলগহীন ঘেঁষা রূপ লাবণ্যের এই পর্যটন স্পটগুলোতে দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। কিন্তু প্রশিক্ষিত ট্যুরিস্ট গাইডের অভাব, নিরাপদ যানবাহনের অপ্রতুলতা, থাকা-খাওয়ার উন্নত ব্যবস্থা না থাকায় পর্যটকরা ভোগান্তিতে পড়েন। জেলার সুধীজন মনে করেন সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে এখানকার নীলনোয়া সৌন্দর্য দেখে বাইরের পর্যটকরা আকৃষ্ট হচ্ছেন। বিশেষ করে সরকারি ছুটির দিন এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে তারা ছুটে আসছেন আকাশ চুরি করা নীলজলে অবগাহন করে নাগরিক দেহমন তৃপ্তি করতে।
২০০০ সালে রামসার সাইট হিসেবে জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ মাদার ফিসারিজ টাঙ্গুয়ার হাওর স্বীকৃতি পেলেও গত এক দশক ধরে পর্যটকদের দৃষ্টি পড়েছে এই হাওরের দিকে। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তাহিরপুর জনসমাবেশে টাঙ্গুয়ার হাওরকে কেন্দ্র করে হাওরাঞ্চলে পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রকল্প গ্রহণের নির্দেশনা দেন। ২০১৩ সালে তার নির্দেশের আলোকে পর্যটন করপোরেশন টাঙ্গুয়ার হাওর ও বড়গোপটিলায় ভূমি অধিগ্রহণ করে। তাছাড়াও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধি দল নানা সময়ে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য সরেজমিন পরিদর্শন করে নানা প্রস্তাব দিয়েছে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও সরকারিভাবে আহ্বান জানানো হয়েছে।

সম্প্রতি টাঙ্গুয়ার হাওরের দীর্ঘ হিজল করচের জলাবন, নলখাগড়ার কান্তার, মৌসুমি পাখিকে কেন্দ্র করে বছরের বিভিন্ন সময়ে পর্যটকদের আনাগোনা বৃদ্ধি পেয়েছে। টাঙ্গুয়ার মধ্যখানে গোলাবাড়ি এলাকায় বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে একটি মিনি রিসোর্ট। ট্যাকেরঘাটে সরকারিভাবে নির্মিত হয়েছে শহিদ সিরাজ কটেজ। জেলা পরিষদও টাঙ্গুয়ার হাওরে দৃষ্টিনন্দন ও পর্যটক সুবিধাসম্পন্ন রিসোর্ট তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তাহিরপুর সদরেও টাঙ্গুয়া ইন নামে হোটেল নির্মিত হয়েছে। গত কয়েক বছরে পর্যটনের কথা মাথায় রেখে স্থানীয়ভাবে নানা উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে।
এলাকাবাসী জানিয়েছেন শীতকালের তুলনায় বর্ষা মওসুমেই টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকদের উপস্থিতি বাড়ে। নৌপথে সহজে যোগাযোগের কারণে অনেকেই এসময় সপরিবারে বেড়াতে আসেন। বেসরকারি কোম্পানি ছুটিডটকমের একটি দৃষ্টিনন্দন লঞ্চও বর্ষাকালীন সময়ে টাঙ্গুয়ায় রাখা হয়। এছাড়াও স্থানীয়ভাবেও প্রায় অর্ধ শত নৌকা এবং কিছু স্পিডবোটও পর্যটকদের যাতায়াতে সেবা দিচ্ছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন ছুটির দিন বিশেষ করে শুক্রবার ও শনিবারে টাঙ্গুয়ার হাওর, শহিদ সিরাজ লেক, লাকমাছড়া, ট্যাকেরঘাট খনি প্রকল্প, বড়গোপটিলা, যাদুকাটা ও শিমুল বাগানে শত শত পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে। এই পর্যটকদের বেশিরভাগই জেলার বাইরের। এলাকাবাসী আরো জানান, পর্যটকরা একসঙ্গে নৌকা দিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর বেড়িয়ে, ট্যাকেরঘাট থেকে শহিদ সিরাজ লেক, লাকমাছড়া, বড়গোপটিলা, যাদুকাটা এবং শিমুল বাগান ঘুরে আবার ট্যাকেরঘাটে ফিরে নৌকা করে তাহিরপুর চলে আসেন। যারা বেশি সময় নিয়ে আসেন তারা মাঝে-মধ্যে নৌকা বা স্থানীয় রিসোর্টগুলোতেও অবস্থান করেন। তবে বেশিরভাগই সারাদিন ঘুরে চলে যান।
তবে জেলার বাসিন্দারা সরকারি ছুটির দিনগুলোতে ঘুরতে ডলুরা, বাঁশতলা ও ঝুমগাঁওসহ বিভিন্ন স্থানে গিয়ে থাকেন। বাইরের পর্যটকদের এখনো এদিকে তেমন দৃষ্টি পড়েনি বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন। এই পর্যটন স্পটগুলোর প্রচারণা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

তাহিরপুর এলাকার লোকজন জানিয়েছেন পর্যটকদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হওয়ার পর তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও ভাবা উচিত। প্রায় সময়ই দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন পর্যটক। সরকারি কোন নিরাপত্তা বাহিনী বা স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী না থাকায় দুর্ঘটনা পরবর্তী সেবা পাচ্ছেনা পর্যটকরা। এদিকে নজর দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
তাহিরপুরের পর্যটন সংগঠনের কর্মকর্তা ও সাংবাদিক বাবরুল হাসান বাবলু বলেন, সরকারি ছুটির দিনগুলোতে অন্তত ৪-৫০ নৌকা তাহিরপুর থেকে পর্যটকদের নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওরে ভাসে। তারা টাঙ্গুয়া ঘুরে ট্যাকেরঘাট শহিদ সিরাজ লেক, যাদুকাটা, বড়গোপটিলা, লাকমাছড়া ও শিমুল বাগান ঘুরে আবার সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসেন রাতে সুনামগঞ্জে পৌঁছে বেশির ভাগ ট্যুরিস্টই নিজ নিজ এলাকায় চলে যান। খুব কম পর্যটকই থাকেন। ভালো সুবিধা থাকলে পর্যটকরা অবস্থান করতেন বলে তিনি জানান।
বেসরকারি সংগঠন ইরার নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, সরকারিভাবে টাঙ্গুয়ার হাওর প্রকল্প থেকে প্রায় অর্ধ শতাধিক ব্যক্তিকে ট্যুরিস্ট হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। যারা প্রশিক্ষণ পেয়েছে তারা কিছু নিয়ম মানেন। তিনি বলেন, পর্যটকরা আসায় তাহিরপুর অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। তবে পর্যটকদের আরো আকৃষ্ট করতে এবং তাদের ধরে রাখতে হলে আবাসিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নুরুজ্জামান বলেন, পর্যটকদের যাতায়াত বাড়ছে। এটা বিবেচনা করে সরকারিভাবে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী