,

Notice :

সুসংস্কৃত মানুষ আসাদ উল্লাহ সরকার

ইকবাল কাগজী ::
সেলিমগঞ্জ বাজারের নিকটবর্তী জামালগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের অন্তর্গত কালাগোজা গ্রামে আসাদ উল্লাহ সরকারের জন্ম ভাষা আন্দোলনের বছর ১৯৫২ সালের ৩১ জুলাই। তিনি ঢাকার কিশোরী লাল জুবিলী হাই স্কুলে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ঢাকা তখন নানান রাজনীতিক কর্মকাণ্ডে খুব সরগরম এবং তিনি তখন থেকেই ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর মনে আছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ শোনার জন্য মিছিলে তিনিও ছিলেন লাখো মানুষের সঙ্গে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর সেদিনের ঐতিহাসিক ভাষণে অনেকের মতো তিনি ও পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারেন, একটা সশস্ত্র যুদ্ধ আসন্ন। তিনি ঢাকায় যে পাড়ায় থাকতেন সে পাড়ার ধুপখোলা হাই স্কুল মাঠে ছাত্র ও অন্যান্যদের সহযোগিতায় লাঠি ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণের আয়োজন করেন।
২৫ মার্চ রাতে আক্রান্ত ঢাকা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ২৭ মার্চ কারফিউ শিথিলের ফাঁকে তিনি ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন। স্থানীয় ছাত্রজনতাকে নিয়ে একটি সংগ্রাম কমিটি গঠন করেন। দেশীয় অস্ত্র ও বন্দুকসহ ধানকুনিয়া স্লুইস গেইটে অবস্থানরত কয়েকজন পাকসেনাকে আক্রমণ করে তাদের কাছ থেকে রাইফেল, বেয়নেট, বাইনোকুলার ইত্যাদি ছিনিয়ে এনে স্থানীয়ভাবে রাইফেল ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেন। উক্ত অপারেশনে তাঁর সহযোগী হিসেবে বিশেষ ভূমিকা রাখেন ধর্মপাশা উপজেলাধীন ইসলামপুর গ্রামের ইব্রাহীম খলিল (পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধা) ও আমীর হোসেন (পরবর্তীতে সুনামগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার)।
যুদ্ধকালীন এলাকায় লঞ্চ চলাচল করতো না। কিন্তু একদিন এম.এল. ঝুনু নামের একটি লঞ্চ এলো। জামালগঞ্জ থানার লক্ষ্মীপুর গ্রাম নিবাসী জামালগঞ্জ থানার তৎকালীন শান্তিকমিটির চেয়ারম্যান আবুল মনসুর আহমদ তালুকদার ওরফে লাল মিয়ার নেতৃত্বে স্থানীয় রাজাকার ও পাকসেনারা মিলে প্রায় ৫০জনের এক বাহিনী। লঞ্চের সামনে ও পিছনে বালির বস্তা দিয়ে তৈরি দুইটি বাঙ্কারে পাকসেনারা এল.এম.জি. তাক করে আছে। লঞ্চ থেকে নেমে তারা আসাদ উল্লাহ সরকার ও তার পিতার সন্ধানে চিরুনি অভিযান চালায়। কিন্তু তাঁদেরকে না পেয়ে গ্রামবাসীদেরকে মারপিট করে। সেলিমগঞ্জ বাজারের আসাদ উল্লাহ সরকার ও তাঁর বড়ভাই ইলিয়াস মিয়া সরকারের দোকান ও বাড়ি লুট করে। বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। ১৯৯০ সালের ২৬ মার্চ তারিখে প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধে সুনামগঞ্জ’ গ্রন্থের ১১৪-১১৫ পৃষ্ঠায় এই ঘটনা সম্পর্কে লেখা হয়েছে, “অতঃপর লাল মিয়া গং সেলিমগঞ্জ বাজারের নিকটবর্তী সাফিজ উদ্দিন সরকারের (মুক্তিযোদ্ধা আসাদ উল্লাহ সরকার অ্যাডভোকেটের বাবা) বাড়ির ১২/১৩টি ঘর আগুন জ্বেলে ধ্বংস করে দেয়।” পাকবাহিনী কর্তৃক বাড়ি পুড়ানোর এই প্রসঙ্গটি নিয়ে তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদের ১০ মে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত একটি প্রত্যয়নপত্র আছে তাঁর কাছে।
সে বাড়ির তিনটি তরুণ, তাঁরা তিন ভাই, গিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। ভারতের তোরা প্রশিক্ষণকেন্দ্রে যুদ্ধপ্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছিল। দেশ স্বাধীন করতে দেশের শত্রু বিতাড়নে প্রাণ বাজি রেখেছিলেন তাঁরা। এই তিনজনের মধ্যে আসাদ উল্লাহ সরকারও ছিলেন।
আসাদ উল্লাহ সরকার সাংবাদিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর (এম.এ.), ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক (বি.এসসি.) ও ঢাকার সেন্ট্রাল ল কলেজ থেকে আইনশাস্ত্রে স্নাতক (এল.এল.বি.) ডিগ্রি অর্জন করেন। এইসব শিক্ষাগত উপাধির সব ক’টিকে ছাড়িয়ে আছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অনতিতরুণ, সেই বলতে গেলে, অবুঝ বয়সের সমাজসংগ্রামের সঙ্গে, দেশকে ভালোবাসর সঙ্গে সম্পৃক্ত মুক্তিযোদ্ধা উপাধিটি। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের পক্ষে এই উপাধির চেয়ে বড় আর কোনও উপাধি নেই। পৃথিবীতে মানুষের জাতীয় মুক্তির ইতিহাসে এর কোনও তুলনা হয় না। আসাদ উল্লাহ সরকার এই ‘মুক্তিযোদ্ধা’ উপাধিটির অধিকারী। এইটিই তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সফলতা।
সফলতার কথাই যখন উঠলো, তাহলে বলি, তাঁর জীবনে সফলতার কোনও অভাব নেই। বালকবেলা থেকে সে সফলতার শুরু। তালিকাটা বেশ দীর্ঘ। তিনি লোকসমাজে আবির্ভূত হয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন রূপে। একাধারে তিনি সমাজসেবক, সাহিত্যিক, শিল্পানুরাগী, বক্তা, সংগঠক, সৃজনশীলকর্মী, পত্রিকা সম্পাদক, রাজনীতিক ইত্যাদি নানা সাংস্কৃতিক অভিধায় বিভূষিত, এক অঙ্গে শতরূপের সমাবেশে মহিমান্বিত এক পুরুষ। আবার পেশায় একজন আইনজীবী (অ্যাডভোকেট)। সত্যি অবাক লাগে, উকিল হওয়ারও দু’বছর আগে ১৯৭৫ সালে তিনি একটি একক চিত্র প্রদর্শনী করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলে। আবির্ভূত হয়েছিলেন চিত্রশিল্পী রূপে। জামালগঞ্জ হাই স্কুলে অনুষ্ঠিত বিজ্ঞান মেলায় একটি একক চিত্র প্রদর্শনী করে দর্শকবৃন্দের ভূয়সী প্রসংশা কুড়িয়েছিলেন।
বাংলাদেশে অনেকে রাজনীতি করে লাভের লোভে। সে-রাজনীতি স্বার্থপরতার। আসাদ উল্লাহ সরকারের রাজনীতি স্বার্থপরতার নয়, পরার্থপরতার। মানবসেবার টানে তিনি রাজনীতি করেন। টানটি কেবল কথার কথা নয়, কাজেরও বটে। তিনি ১৯৭২ সালে সেলিমগঞ্জ বাজারে একটি হাসপাতাল, ১৯৭৬ সনে একটি ডাকঘর (পোস্ট অফিস) ও পরবর্তীতে তাঁর বাবার নামে জামালগঞ্জ সংলগ্ন দক্ষিণ কামলাবাজ গ্রামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চিকিৎসা সুবিধাবঞ্চিত গরিব লোকদের জন্য জামালগঞ্জ সদরে ‘ফ্রি ফ্রাইডে ক্লিনিক’ ও সাচনাবাজারে ‘আহসান উল্লাহ সরকার দাতব্য চিকিৎসালয়’ স্থাপন করেন। জামালগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হয়েছেন পর পর দুই বার। ১৯৯৮ সালে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন এবং তখন ঈর্ষণীয় সফলতার সঙ্গে গ্রাম আদালতের বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন, যা তিনি শুরু করেছিলেন ১৯৯০ সালের ১ জুলাই। জামালগঞ্জ থানা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার ছিলেন টানা ১৩ বছর।
প্রশ্ন করা যেতে পারে যে, আসাদ উল্লাহ সরকার আসলে কী ছিলেন না বা কী নন? সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তিনি অগ্রণীজন। লিখেছেন গল্প, কবিতা ও নাটক। নাটক পরিচালনা, মঞ্চায়ন ও অভিনয়ও করেছেন। করেছেন সাংবাদিকতা। ত্রৈমাসিক জামলগঞ্জ পরিক্রমা, পাক্ষিক সুরমা, গ্রেনেড, মুক্তিযোদ্ধা ইত্যদি পত্রিকাসহ সংকেত, আলোক বর্তিকা, অরণি, মোনালিসা, শিমুল পলাশ ফাগুন ইত্যাদি সাহিত্যসংকলন প্রকাশ করেছেন। এমনকি প্রচ্ছদশিল্পীর ভূমিকায়ও অবতীর্ণ হয়েছেন। তিনি দ্বাদশ রবির দেশে, মোনালিসা ও শিমুল পলাশ ফাগুন নামক একটি বই ও দুইটি সাহিত্য সংকলনের প্রচ্ছদ অঙ্কন করেছেন। খোঁজ করলে এই তথ্য মিলতে পারে যে, তিনি একজন যাদুশিল্পী বা যন্ত্রশিল্পীও বটে।
আসলে আসাদ উল্লাহ সরকার অপাদমস্তক একজন সুসংস্কৃত মানুষ, চেহারায় তিনি যেমন নায়কসুলভ সৌম্যমূর্তির, তাঁর মনটিও তেমনি সৌম্যতার প্রদীপ্ত প্রতীক, যাকে বলে ‘মানুষে বিরাজে মানুষ’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী