,

Notice :

জননেতা আয়ূব বখত জগলুল : স্মৃতির মণিকোঠায় তুমি অমর

ম ফ র ফোরকান ::
(পূর্ব প্রকাশের পর)
কিছু লিখতে গেলে হাতের কাছে তথ্য-উপাত্ত থাকতে হয়। আমার পরম শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক অ্যাডভোকেট শহীদুজ্জামান চৌধুরী প্রায়ই প্রতিটি ঘটনা ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করে রাখার তাগিদ দিয়ে থাকেন। কিন্তু তাঁর উপদেশটি সব সময় অনুসরণ আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে না। আমি কখনো লিখি; আবার কখনো আলসেমী এসে ভর করলে ফল যা হবার তাই হয়। আমাদের তথ্য ভা-ার শহীদুজ্জামান ভাইয়ের সঙ্গে সিলেটে স্থানান্তরিত হয়ে যাওয়ায় ইদানিং মাঝে-মধ্যে বিপাকে পড়তে হচ্ছে আমাকে। কথিত ‘জননন্দিত জনপ্রতিনিধি’ যেদিন অবৈধ অস্ত্রসহ ধরা পড়েছিল, সেদিন সুনামগঞ্জ কলেজে সংসদের ভোটের বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেনি- ঘটেছিল মনোনয়নপত্রের বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা। তথ্যগত এ ভুলটি ধরিয়ে দিয়েছেন তখনকার তুখোড় ছাত্রনেতা মানবেন্দ্র তালুকদার পিনু। ভুল শুধরে দেয়ায় বন্ধুবর পিনুর কাছে আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে পারলাম না।
মূল লেখায় ফিরে আসি। প্রায় ২ মাস আগে আমার সঙ্গে দেখা করলো এক যুবক। এ শহরের আরপিননগরেই তার বাড়ি। বিএনপি’র ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের সঙ্গে জড়িত সে। সাপ্তাহিক স্বজন-এর একটি বিশেষ সংখ্যা তার খুবই প্রয়োজন। সংখ্যাটি ১৯৯৬ সালের কোনো এক মাসের।
১৯৯৬ সাল। সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী স্কুলের খেলার মাঠে আওয়ামী লীগের জনসভা। মঞ্চে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি শেখ হাসিনা ‘কথিত জননন্দিত জনপ্রতিনিধি’র আপন তিন ভাইয়ের নাম উচ্চারণ করে বলেছিলেন, “ওরা গরু-ছাগলের মত হাটে হাটে বিক্রি হয়।” অতঃপর ঐ তিন ভাইকেই আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করেন শেখ হাসিনা। এর প্রতিবাদ স্বরূপ শহরে জুতা মিছিল বের হয় বহিষ্কৃতদের পক্ষ থেকে। আমার কাছে আগত যুবকটি ঐসব সংবাদ সম্বলিত সাপ্তাহিক স্বজন-এর কপি চাচ্ছে। তার কথা- প্রয়াত মেয়র জগলু মৃত্যুর ২ দিন আগে এক আলোচনায় তাকে বলে গেছেন- ‘ফোরকানের সঙ্গে দেখা করো। আমার কথা বলবে তাকে। আশা করি নিরাশ করবে না তোমাকে।’
যুবকটির কথায় আনমনা হয়ে গেলাম। ভাবতে লাগলাম, আওয়ামী লীগের মাঠের খেলোয়াড় জগলু, আবার প্রতিপক্ষ বিএনপি’র রিমোটটিও তার হাতে। জিনিয়াস আর কাকে বলে!
টিএলসিসি অর্থাৎ নগর সমন্বয় কমিটির একদিনের এক সভার কথা বলি। টিএলসিসিকে বলা হয়, পৌরসভার সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম।
জগলু’র সর্বশেষ নির্বাচনের মাস তিনেক আগে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে টিএলসিসি সদস্যদের অবহিত করতে জরুরিভিত্তিতে ডাকা হয় এ সভা। এ সভায় আমি ছিলাম লেট কামার। আমি আসার অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল সভা। লজ্জাবনত মাথায় হল ভর্তি রুমের দরজা ধাক্কা দিতেই আমার কানে এসে বাজে- “আমি তো ভাবতাম, ফোরকানরা অনর্থক লেখালেখি করে মউজদীন ভাইকে বিব্রত করেছে। এ চেয়ারে বসার পর তো দেখলাম, তারা যা লিখে গেছে বছরের পর বছর তার প্রত্যেকটা বর্ণই সত্য।” এমন বক্তব্যের মধ্যেই আমি নিঃশব্দে একেবারে পেছনের একটা চেয়ারে বসে পড়ি এবং কোন বিষয়টা নিয়ে আলোচনা চলছে তা বুঝতে মনোযোগী হই। বক্তব্যের এক ফাঁকে মেয়রের নজর পড়ে হল রুমের সব পেছনে বসা আমার ওপর। সঙ্গে সঙ্গে সামনের সারিতে বসা আমার এক ¯েœহভাজনকে তুলে দিয়ে আমাকে ডাকলেন সামনে আসতে, যেখানে বসা শ্রদ্ধেয় পরিমল স্যার ও যোগেশ্বর স্যার। তারা দু’জনও ডাকতে থাকলেন তাঁদের কাছে আসতে। পরিমল স্যার বললেন, “এতক্ষণ তোমাকে নিয়েই কথা হচ্ছিল। পৌরসভা নিয়ে তোমাদের দীর্ঘদিনের লেখালেখি।”
তারপর তিনি আরো দৃঢ়তার সঙ্গে যে কথাটি বলেছিলেন তাহলো, “আমরা তখনই বলেছিলাম, শহীদুজ্জামান-ফোরকানরা যেহেতু লিখছে তা অমূলক হবে না। ডকুমেন্ট হাতে নিয়েই লিখবে। টু শব্দটি করারও সুযোগ দেবে না তারা।”
এ সভায়ই জানতে পারলাম, জগলুর প্রাণান্ত প্রচেষ্টা, গায়ের রক্ত পানি করা শ্রম ব্যর্থতায় পর্যবশিত হয়েছে। ইউজিপ-৩ প্রকল্প থেকে ছিটকে পড়েছে সুনামগঞ্জ পৌরসভা। এর একমাত্র কারণ জগলু নির্বাচিত হয়ে আসার পূর্ববর্তী তিন তিনবারের জননন্দিত চেয়ারম্যান ও তৎপরবর্তী ভারপ্রাপ্ত মেয়রের সময়কার বকেয়া বিদ্যুৎ বিল, টেলিফোন বিল, ভ্যাট এবং অবাধ, বেপরোয়া ও নজিরবিহীন লুটতরাজ।
পৌরসভার টাকায় কারো বাড়ির রাস্তা তৈরি করে দেওয়ার কোন নজির অন্য কোন পৌরসভায় আছে কিনা জানি না। কিন্তু সুনামগঞ্জ শহরে মোহাম্মদপুরে এ নজির স্থাপন করে দেখিয়ে গেছেন তৎকালীন জননন্দিত চেয়ারম্যান। আর যার বাড়ির রাস্তাটি করে দিয়েছেন তিনি একজন সম্মানিত সাংবাদিক। চেয়ারম্যানের ভাষ্যই ঠিক- “তিনি যা বলেন তা-ই আইন।” লাখ লাখ টাকার টেলিফোন বিল বকেয়া পড়ার কাহিনী জানার আগ্রহ থাকলে শুনুন।
মোবাইল ফোন বাজারে আসার আগে সুনামগঞ্জের প্রায় ৯৯% সাংবাদিক তাদের নিজ নিজ পত্রিকায় নিউজ পাঠাতেন পৌরসভার টেলিফোনে। এতে জয় ডংকা বাজত চেয়ারম্যানের। আর বস্তা ভরা বিল এসে পড়ত পৌরসভার ঘাড়ে। পৌর চেয়ারম্যানের প্রিয়ভাজনদের বাড়ির নিজের আঙিনার লাইট পোস্টে জ্বলা বাল্ব লাগিয়ে দিতো পৌরসভা, সেই সাথে বিলও পৌরসভাকে বহন করতে হতো। শুধু কি তাই, চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে দেশের বাইরে অর্থাৎ ইংল্যান্ড, আমেরিকায় টেলিফোনে যে কথা হত তার বিল এসে জমা হতো পৌরসভার হিসাবে। চেয়ারম্যানের বাসার নাস্তার বিলের টাকা তাও শোধ করার দায়িত্ব পৌরসভার।
সাবেক মহারথীদের পুঞ্জিভূত এ ঋণের মাথা পাক খাওয়া হিসাবের যোগফলটা দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন মেয়র জগলুল। কিন্তু শোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় ইউজিপ -৩ থেকে আছড়ে পড়তে হয় সুনামগঞ্জ পৌরসভাকে।
২০০১ সালে আমি অবৈধ অস্ত্রধারীদের ঘেরাওয়ের শিকার হই। পৌর বিপণিস্থ আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘হট লাইনে’র বন্ধ করা দরজার সম্মুখ দিয়ে দু’জন লোক অস্ত্র নাড়াচাড়া করে ঘোরাঘুরি করছিল। এর কি কারণ তাও আমার অজানা ছিল না। বাধ্য হয়ে আমি ঘটনাটি অবহিত করি বন্ধু জগলুকে। জবাবে জগলু বলেন, দরজাটা বন্ধ করে কয়েক মিনিট চুপচাপ বসে থাক। আমি দেখছি। প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যে একটি মোটর সাইকেল এসে থামলো আমাদের দোকানের সামনে। সাইকেলটি কে চালিয়ে আনলো এ মুহূর্তে তার নামটি স্মরণে আসছে না। পেছনে ছিলেন সুনামগঞ্জ কলেজের এককালের ভিপি, প্রভাবশালী রাজনীতিক সাইফুর ভাই। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে দরজা খোলে মোটর সাইকেলে উঠে বসি আমি। তারপর অস্ত্রওয়ালাদের সামনে দিয়েই এগিয়ে যায় আমাদের বহন করা মোটর সাইকেলটি।
কেন এমন ঘটনাটির উদ্ভব হয়েছিল তা জেনে নেওয়া যাক।
সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারের সম্মুখে একখ- ভূমি ছিল। পাশেই ছিল জেলারের বাসা। এ ভূমি প্রায় ৭৫ বছর ধরে ছিল কারাগারের দখলে। এ ভূমিতে কয়েদীরা বাগান করতো। ২০০১ সাল। হঠাৎ এ ভূমির মালিক বলে দাবি করে বসে সুনামগঞ্জ পৌরসভা। তৎকালীন পৌর চেয়ারম্যান এ ভূমি আবার বন্দোবস্ত দিয়ে দেন এ শহরেরই এক অতি প্রভাবশালী ব্যক্তিকে। লিজ গ্রহীতারা ভূমির দখল ছাড়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত করে তুলেন কারা কর্তৃপক্ষকে। অপরদিকে মাটি ভরাটও শুরু করে দেয়া হয়। ইতোমধ্যে দু-এক ট্রাক মাটিও ফেলা হয়ে গেছে। এ অবস্থায় কারা কর্তৃপক্ষ পড়েন মহাবিপাকে। জেলার ঘুরতে থাকেন সাংবাদিকদের দ্বারে দ্বারে। জেলারের কথা হল, ভূমি পৌরসভা নিয়ে যাক, আমার কিছু যায় আসে না। আমি যে বাধা দিয়ে ব্যর্থ হয়েছি সেটার প্রমাণ স্বরূপ একটা নিউজ পত্রিকায় ছাপা হলেই আমি গরিবের সন্তান রক্ষা পেয়ে যাই। কিন্তু পৌর চেয়ারম্যানের বিপক্ষে যায় এমন সংবাদটি থেকে ‘পৌরপোষ্য’ সব সাংবাদিকই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলেছেন।
অতঃপর দায়িত্ব এসে বর্তায় আমার কাঁধে। কি আর করা! রাতেই সংবাদটি গেল টেলিফোনে। দৈনিক ইনকিলাব এ সংবাদ ছাপলো প্রথম পাতায়। আর যায় কোথায়! সকালেই ফোন আসে হোম সেক্রেটারির। হন্তদন্ত ডিসির নির্দেশে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ এসে ঘেরাও করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় উপর্যুক্ত ভূমি।
এ ঘটনায় তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেন ভূমি বন্দোবস্ত পাওয়া ব্যক্তিবর্গ ও বন্দোবস্ত দানকারী চেয়ারম্যান। চৈত্রের কাঠফাটা রোদে গরু হারালে যেমন মাথা গরম হয়ে উঠে মানুষের, তেমনি ভূমি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় তাদের অবস্থাও দাঁড়ায় সে রকম। রাগ গিয়ে পৌঁছে সপ্তমে। ফলশ্রুতিতে তাদের পালিত দু’জন অস্ত্রবাজকে নামিয়ে দেন তারা রাস্তায়। অস্ত্র হাতে তারা আমাদের দোকানে আমার খোঁজে আসতে থাকে বারবার। উপর্যুপরি বেশ ক’বার চড়াও হয় তারা জেলারের বাসায়। ভীত সন্ত্রস্ত জেলার আমাদের সহযোগিতা চাইলে আমরা তাঁকে অভয় দিই। বলি, আপনার হাতে অনেক ক্ষমতাশালী অস্ত্র মজুদ আছে। আপনি সিস্টেম করে রাখেন। অস্ত্রবাজরা আবার এলে আপনি সিগন্যাল পাঠাবেন জেলে। সেই সিগন্যাল পাওয়ামাত্র জেলের দায়িত্বপ্রাপ্তরা বাজাতে থাকবে ‘পাগলা ঘণ্টা’। তখন দেখবেন অস্ত্রওয়ালারা কোথায় যায়! আমাদের ফাঁদে এসে পা দেয় বারবার ধান খেয়ে যাওয়া ঘুঘুরা। সঙ্গে সঙ্গে বেজে উঠে পাগলা ঘণ্টা। পাগলা ঘণ্টার শব্দে পোশাকধারী প্রায় সব বাহিনীর লোক ছুটতে থাকে জেল অভিমুখে। অস্ত্রধারী দু’জন যে যেদিকে পারে দেয় ছুট। একজন শেষ পর্যন্ত পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জামাইপাড়াস্থ জনস্বাস্থ্য অফিসের কাছে। তিনি আবার সুনামগঞ্জ পৌরসভারই সে সময়কার একজন মেম্বার। অন্যজনকে খুঁজে পায়নি পুলিশ। ধৃত মেম্বারকে ডা-াবেড়ি পরিয়ে কোর্টে আনা হয়েছে বহুদিন। সুনামগঞ্জ কারাগারের ভূমিটি ভূমিখেকোদের কবল মুক্ত হয়। এক সময় জেলারও বদলি হয়ে যান সুনামগঞ্জ থেকে। যাবার সময় বাসায় এসে আমার সাথে দেখা করে যান জেলার এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বললেন- “আপনি যে উপকারটা করলেন, তার জন্য রোজ হাসরে আপনার সঙ্গে দেখা হবে আমার।” আমি অনেক জোরাজুরি করলাম। কিন্তু এক কাপ চা খাওয়ারও ভরসা পাননি তিনি। আতঙ্কিত ছিলেন তিনি, যদি জানাজানি হয়, আবার কোন বিপদ নেমে আসে তাঁর কপালে। (চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী