,

Notice :

জননেতা আয়ূব বখত জগলুল : স্মৃতির মণিকোঠায় তুমি অমর

ম ফ র ফোরকান ::
(পূর্ব প্রকাশের পর)
স্মৃতিচারণে খুবই দুর্বল আমি। মনে ধরে রাখতে পারি না কোন ঘটনাই বেশি দিন। মাঝে মধ্যে মনের দুয়ারে এসে উঁকি দেয়। পরক্ষণেই আবার উড়াল মারে। খুঁজে আর বের করা সম্ভব হয়ে উঠে না হাজার চেষ্টা করেও।
জগলুর মৃত্যুর কয়েক মাস আগের একটি ঘটনা মনে পড়লো। অনেকদিন ধরে মেয়রের সঙ্গে দেখা হয়নি। এমনি অবস্থায় ফোন এলো মেয়রের মোবাইল ফোন থেকে। রিসিভ করা মাত্র স্বভাব সুলভ হাসির সঙ্গে বললেন, “কোয়াইবা সাংবাদিক সাব, মরছি না আছি একবার খবরটাও লও না দেখি?” কথাটা শুনে আমিও হাসতে লাগলাম উচ্চ স্বরে। তারপর অনেক দিনের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ না হওয়ার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলাম। জানালাম আমার কৈফিয়ত। বিদেশে আমার ভাইয়েরা পরিবার নিয়ে বিপদে আছে। নিদারুণ দুরবস্থায় সময় কাটাচ্ছি আমি। তাই দেখা-সাক্ষাৎ হচ্ছে না আগের মত। কিন্তু খোঁজ-খবর রাখা হচ্ছে নিয়মিতই। আমার কথা শুনে তিনি বললেনÑ একবার আসলে তোমাদের সমস্যাটা জানবো সামনা-সামনি বসে। উত্তরে আমি বললাম, মউজদীন আমাকে বলেছিল, ভিক্ষার থাল হাতে তুলিয়ে ছাড়বে। আমার অবস্থা যেন সে দিকেই যাচ্ছে। প্রত্যুত্তরে তিনি বলেছিলেন, কেউ কাউকে ভিক্ষার থাল হাতে তোলাতে পারে না। এই ক্ষমতার মালিক একমাত্র আল্লাহ। কথাটির রেশ থাকতে থাকতেই অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে আসা জগলুর প্রাণখোলা হাসিতে মনটা জুড়িয়ে গেল আমার।
তাঁর মৃত্যুর দু’চারদিন আগের কথা। কালিবাড়ি পুকুরের পাড়ে ফুটপাত নির্মাণ ও রেলিং স্থাপনের কাজ শুরুর আগে সরেজমিনে দেখতে সশরীরে এসে হাজির হন সেখানে। আমরা কয়েকজন বসেছিলাম বন্ধু রণ’র দোকানে। হঠাৎ নজরে পড়লো একদল লোকের সমাগম এবং এর পুরোভাগে রয়েছেন মেয়র আয়ূব বখত জগলুল। দেখামাত্র আমরা যার যার মোবাইল ফোন বের করে ফেসবুকে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। বুদ্ধিমান জগলু বুঝে ফেললেন বিষয়টি। ফলে দোকান মালিক রণকে ডেকে ইশারা করলেন আমাদের দিকে। বললেন, দেখ দেখ, আমারে দেইখ্যা এরা মোবাইল লইয়া ব্যস্ত অই গেছে।
লজ্জা পেয়ে আমি বলেছিলাম, ফেসবুক জগৎ তো আরেক নেশার জগৎ। একবার ঢুকলে এ জগৎ থেকে আর মাথা তোলা যায় না। তিনি হাসতে লাগলেন। অতঃপর হেসে হেসে এখানে আসার বিষয়টি পরিষ্কার করলেন আমাদের কাছে। বললেন, কালিবাড়ি পুকুর ও এর পাড় উন্নয়নে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এই বিষয়টি ব্যবসায়ী ভাইদের অবহিত করতে এসেছি। এ আলাপই তাঁর সঙ্গে আমার শেষ আলাপ।
১৯৯৯ সনের নির্বাচন নিয়ে কিছু লিখতে চাই। নির্বাচনে সহযোগিতা চেয়ে আমাদের সঙ্গে অর্থাৎ শহীদুজ্জামান ভাই আর আমার সঙ্গে আলাপে বসলেন জগলু। আমাদের সাফকথা তেঘরিয়া কেন্দ্র ও লবজান স্কুল কেন্দ্রের জাল ভোট দেওয়া বন্ধ করতে না পারলে অপর প্রতিদ্বন্দ্বীর বিজয় ঠেকানো সম্ভব নয় কোনক্রমেই। এরজন্য আমাদের প্রস্তাব ছিল, উপর্যুক্ত কেন্দ্র দুটোতে ভিডিও ক্যামেরা দিয়ে কয়েকজন সাংবাদিককে এসাইনম্যান্ট দেওয়া। এ সুযোগ জগলুর ছিলও। তাঁদের রয়েছে নিজস্ব একটি পত্রিকা- ‘সাপ্তাহিক সুনামগঞ্জ রিপোর্ট’। ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে একবার আমরা সুনামগঞ্জের প্রায় সাংবাদিক ডিউটি করেছিলাম একটি ইউপি নির্বাচন কেন্দ্রে। অভিযোগ ছিল, এ ইউনিয়নের খুবই প্রতাপী চেয়ারম্যান বারবার নির্বাচিত হয়ে থাকেন ভোট ডাকাতির মাধ্যমে। এ কাজের জন্য ভাড়াটে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী আমদানি করতেন তিনি নরসিংদী থেকে। তার বাড়ি সংলগ্ন ভোট কেন্দ্রে কর্মরত নির্বাচনী কর্মকর্তা ও পুলিশদের ম্যানেজ করে রাখতেন তিনি। আর অবাধে ভোটের বাক্স ভর্তি করার কাজটি সমাধা করতো তার আমদানীকৃত সন্ত্রাসীরা। বিজয়ের মালা গলায় পরতে অপর দু’কেন্দ্রের ফলাফলের খুব একটা মুখাপেক্ষী হতে হতো না তার। উপর্যুক্ত কেন্দ্রটিতে আমাদের গমন ছিল বারবার নির্বাচিত ঐ চেয়ারম্যানের কাছে পাকা ধানে মই দেওয়ার মতো অপ্রত্যাশিত। পরিণামে পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল তাকে।
১৯৯৯ সালের পৌর নির্বাচনে জগলু চাইছিলেন সাপ্তাহিক ‘স্বজন’ নামুক এই ভূমিকায়। তিনি চাইলেন, কাজটি হোক আমার নেতৃত্বে। আমি রাজি হলাম না কৌশলগত কারণে। কৌশলগত কারণ বলতে কি বুঝাতে চাচ্ছি আশা করি তা সবারই বোধগম্য। জগলুও ব্যর্থ হলেন তাঁদের পত্রিকাকে মাঠে নামাতে। ফল যা হবার তাই হল। বেপরোয়া ভোট ডাকাতি আর নজিরবিহীন দুর্নীতির আশ্রয়ে জগলুকে পরাজিত করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে যান অপর প্রতিদ্বন্দ্বী। সত্য প্রমাণিত হয় আমাদের আশঙ্কাই।
কেমন বেপরোয়া ও নজিরবিহীন দুর্নীতির মাধ্যমে ‘কথিত জননন্দিত ব্যক্তি’ তৃতীয়বারের মতো বিজয়ের মাল্য গলায় পরেছিলেন, তার বর্ণনাটি শুনুন তাহলে।
১৯৯৯ সালে জগলুকে পরাজিত দেখানো হয় নগণ্য সংখ্যক ভোটের ব্যবধানে। আর এই ব্যবধান সৃষ্টিতে যেসব অপতৎপরতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল তা এ যুগে কল্পনাতীত। জগলু সব জেনে-শুনেও অন্যায়ের কোনরূপ প্রতিবাদ না করে নিশ্চুপ থাকেন। এর কি কারণ আমরা কেউ জানি না। এক সময় শুনেছি, পর পর দুই ভাই মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ায় তাঁর মা নাকি নিষেধ করেছিলেন এ নিয়ে কোনরূপ ঝামেলায় না জড়াতে। এজন্য মাতৃভক্ত জগলুকে ঘরে বসে থাকতে হয়েছিল।
১৯৯৯ সালের পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ফেব্রুয়ারি মাসে। প্রকাশিত গেজেটে মোট ভোটার ছিল ২৪,৯৯৬ জন। নির্বাচনের দিন ২৩টি ভোট কেন্দ্রে নির্বাচন অফিসার সরবরাহ করেন ২৩,৫৭১ জন ভোটারের তালিকা। এরমধ্যে বহু তালিকা ছিল হাতের লেখা। ফটোস্ট্যাট কপিও ছিল কিছু কিছু। অপর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পারিবারিক ইটের ভাটার শ্রমিক, রিকসাচালক ও ঠেলাচালকদের ভোটারভুক্ত করতে নেওয়া হয়েছিল উপর্যুক্ত কৌশল। এ অপকৌশলে ৬ শতাধিক ভুয়া ভোটারের ভোট নিশ্চিত করে নেন ‘বুদ্ধিমান’ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। উল্লেখিত ৬ শতাধিক ভোটারের কেউ সুনামগঞ্জ পৌরসভার অধিবাসী ছিলেন না। নগদ নারায়ণের প্রভাবে টাল হয়ে এ কা-টি ঘটান জেলা নির্বাচন অফিসার এএনএম হায়দার আলী।
নজিরবিহীন পন্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ওই প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণার বিষয়ে ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ তারিখ প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু হেনা বরাবরে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ইলেক্টোরেল রুল অনুযায়ী শাস্তি দাবি করে একটি অভিযোগ পাঠানো হয়। অভিযোগকারী ছিলাম আমি নিজে। অভিযোগটির সত্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন পেশ করার জন্য দায়িত্ব পান উপ-নির্বাচন কমিশনার, চট্টগ্রাম।
একই সঙ্গে সংবাদটি ছাপা হয় সাপ্তাহিক স্বজন পত্রিকায়। স্বজন সংবাদ ছাপলো না যেন ‘বোমা’ মারলো। হৈ চৈ পড়ে গেলো গোটা শহরে। পত্রিকার জন্য শহরবাসীর মধ্যে সে কী কাড়াকাড়ি। গত ৭/৮ বছরের মধ্যে কত পত্রিকাই তো বেরুলো এ শহর থেকে। স্বজন যা প্রায়ই করে দেখিয়েছে, এমন দৃশ্য এ পর্যন্ত আর কেউ কি আরেকটি উপহার দিতে পেরেছে পাঠক সাধারণকে? যাক সে কথা। মূল আলোচনায় ফিরে আসা যাক আবার। অভিযোগের কারণে জেলা নির্বাচন অফিসার এ.এন. হায়দার আলী ইতিপূর্বে বদলি হয়েছিলেন গোপালগঞ্জ। তদন্তকালে তাকে স্বশরীরে সুনামগঞ্জ উপস্থিত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট তারিখ ও সময়ে উপস্থিত থাকতে চিঠি আসে আমার কাছেও। পূর্ব নির্ধারিত তারিখে শহীদুজ্জামান ভাই, আমি, জেলা নির্বাচন অফিসার ও অভিযুক্ত সাবেক জেলা নির্বাচন অফিসারের সামনে তদন্ত শুরু করেন উপ-নির্বাচন কমিশনার মো.সিরাজুল ইসলাম। (চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী