,

Notice :

জননেতা আয়ূব বখত জগলুল : স্মৃতির মণিকোঠায় তুমি অমর

ম ফ র ফোরকান ::
প্রায় দেড় যুগের আন্দোলন, সংগ্রাম আর নির্বাচনী যুদ্ধ শেষে আয়ূব বখত জগলুল যখন পৌর মেয়রের চেয়ারে বসলেন, ঠিক তখনই জানতে পারলাম সুনামগঞ্জ পৌরসভার তহবিল পুরোপুরি শূন্য। লুটেরাদের রাক্ষসী পেট হজম করে ফেলেছে সব। জগলুল মেয়র হওয়ায় যেসব সংবাদকর্মী উল্লসিত ছিলেন তাদের প্রায় সবার উল্লাস ফুটো বেলুনের মত চুপসে গেল মুহূর্তেই। কোটি কোটি টাকা ঋণের বোঝা নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন মেয়র আয়ূব বখত জগলুল। লাখ লাখ টাকার টেলিফোন বিল বকেয়া, বিদ্যুৎ বিল বাকি, বেআইনি পন্থায় ভ্যাট কর্তৃপক্ষের পাওনাও রাখা হয়েছিল অপরিশোধিত। শুধু তাই নয়, ঋণের মস্তবড় বোঝা ছিল আরেকটি। সেটি হলো, আদর্শ শিশু শিক্ষা নিকেতনের ৩ শিক্ষিকার দীর্ঘ কয়েক বছরের বকেয়া বেতন। নির্বাচনে নিজের পক্ষে কাজ না করার ‘অপরাধে’ এই স্কুল থেকে ওই শিক্ষিকাদের পত্রপাঠ বিদেয় করে দেন তৎকালীন চেয়ারম্যান। শিক্ষিকারা হাইকোর্ট থেকে সমুদয় বকেয়া পরিশোধের আদেশ নিয়ে এলে মহাঝামেলায় নিপতিত হন নবনির্বাচিত মেয়র জগলুল।
একদিকে আদালত অবমাননার খড়গ অন্যদিকে ইউজিপ-১ প্রকল্পভুক্ত হওয়ার জন্য উপর্যুক্ত ঋণসমূহ পরিশোধের অন্য কোনো বিকল্প ছিল না তখন। সুদক্ষ নেতা জগলুল বকেয়া পরিশোধের সকল ধকল সামলে নিতে গ্রহণ করেন একের পর সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ। আর তাতে সফলতাও পান খুব দ্রুত। এজন্য দিনরাত পরিশ্রম করতে হয় জগলুলকে। সুনামগঞ্জ পৌরসভায় উন্নয়নে দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য তিনি হয়ে যান পাগলপ্রায়। এরপর সুনামগঞ্জের আপামর জনগণ দেখলো অভূতপূর্ব উন্নয়ন কর্মকা-। বারবার নির্বাচিত হয়েও কোন কোন পৌর চেয়ারম্যান যে পৌরসভায় দৃশ্যমান উন্নয়নের কোন চিহ্ন রেখে যেতে পারলেন না, বরং রেখে গেছেন কটু ও উৎকট দুর্গন্ধযুক্ত পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি, সেই পৌরসভায়ই জগলুল বইয়ে দিলেন চোখ ধাঁধানো দৃশ্যমান এবং টেকসই উন্নয়নের বন্যা।
অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে পৌরভূমি উদ্ধার করে ঢাকা কিংবা চট্টগাম সিটির মতো প্রশস্ত সড়ক উপহার দিলেন তিনি সুনামগঞ্জবাসীকে। নোংরা অলিগলি ও কর্দমাক্ত পরিবেশে থেকে মাছ ব্যবসায়ী ও ক্রেতাসাধারণকে উদ্ধার করেন তিনি। ঠাঁই দেন দৃষ্টিনন্দন কিচেন মার্কেটে। এরজন্য মাছ বাজার ও সবজিবাজার স্থানান্তর জরুরি হয়ে পড়ে। এ সময় জগলুলের পাশে এসে দাঁড়ান সুনামগঞ্জের প্রসিদ্ধ ‘বামা ফার্মেসী’র মালিক আমাদের রজতদা। তিনি বাজারের স্থান দেন তাঁদের পারিবারিক ভূমিতে। ব্যক্তি মালিকানার ভূমিতে বাজার বসানোর অনুমতি আদায় করাটা একমাত্র আয়ূব বখত জগলুলের পক্ষেই সম্ভব। নতুবা ভূমি হারানোর ঝুঁকি নিতে যাবে কোন উন্মাদ! রজতদা সে ঝুঁকিটি নিয়েছিলেন। আর তা নিয়েছিলেন একমাত্র জগলুর ওপর তাঁর অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস থাকার কারণেই। এরই ফলশ্রুতিতে আজ আমরা ভোগ করছি আধুনিক ও নজরকাড়া কিচেন মার্কেটের সুফল। এ মার্কেটটি করতে গিয়ে জগলুর গায়ের কতটুকু রক্ত পানি হয়েছিল তা কেবল তিনিই জানেন। আর কিছুটা বলতে পারবে তাঁর কয়েকজন সুহৃদ-শুভানুধ্যায়ী।
সকাল থেকে গভীর রাত অবধি তিনি থাকতেন অফিসেই। কিচেন মার্কেটের কাজ স¤পন্ন না হওয়া পর্যন্ত মেয়র জগলুল কোনোদিন দুপুরের খাবার তার পরিবার-পরিজনের সঙ্গে করেছেন, এমন দাবি কেউ করতে পারবেন বলে আমি বিশ্বাস করি না। সাক্ষী একমাত্র জগলুলের ছায়াসঙ্গী সাজিদুর রহমান। তার পক্ষেই কেবল বলা সম্ভব, সুনামগঞ্জ পৌরসভাকে আধুনিক, দৃষ্টিনন্দন ও পরিকল্পিত ও জবাবদিহির পৌরসভায় পরিণত করার অসাধ্য সাধনে কি দুর্বিষহ যাতনা সহ্য করতে হয়েছিল স্বপ্নবাজ জগলুলকে।
২০১১ সালের নির্বাচনের পূর্বে সুনামগঞ্জবাসীকে এ প্রতিশ্রুতিই দিয়েছিলেন তিনি ‘সাপ্তাহিক স্বজন’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে বীরত্ব দেখানোর পাশাপাশি জগলুলকে তখনকার প্রতিটি মুহূর্ত ব্যয় করতে হয়েছিল আশ্চর্য দূরদর্শীতায়। নাগরিকদের করের টাকায় সমৃদ্ধ পৌর তহবিলের প্রতিটি টাকা আঁকড়ে রাখতেন তিনি যক্ষের ধনের মতো। টাকা মারার ফাঁক-ফোঁকড়গুলো বন্ধ করতে তাঁকে থাকতে হতো অতন্দ্র প্রহরীর মতো সদাজাগ্রত। তাঁর নেওয়া পদক্ষেপ একদিকে যেমন ছিল বেপরোয়া, অন্যদিকে তেমনি ছিল বুদ্ধিদীপ্ত। চাতুর্যের আশ্রয়ে পৌর তহবিল তছরুপের প্রচেষ্টা চালিয়ে মাঝেমধ্যে ধরা খেয়েছেন কোন কোন কর্মকর্তা-কর্মচারী। এ কারণে কি লেজে-গোবরে অবস্থা তাদের! এমন দু-চারটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করার ‘সৌভাগ্য’ও হয়েছিল আমার। তাদের তালগোল পাঁকানো চেহারা এখনো চোখের সামনে মাঝেমধ্যে ভেসে উঠে। সেই সঙ্গে ভেসে উঠে সেই মহান মেয়রের ছবি, যার তুলনা এ যুগে সত্যিই বিরল। আমার কাছ থেকে একদিনের একটি কাহিনী শুনে সুনামগঞ্জের একজন খ্যাতিমান আইনজীবী গর্ব করে বলেছিলেন, জগলুল যে হোসেন বখত-এর সন্তান, এ ঘটনা তারই প্রমাণ।
পৌরসভা পরিচালনায় জগলুল প্রথমেই ষড়যন্ত্রের মুখে পড়েন। চালানো হয় টেন্ডার বাক্স ছিনতাইয়ের পরিকল্পিত প্রচারণা। মেয়র জীবনের প্রথম টেন্ডারেই এমন মিথ্যা প্রচার! বিচলিত হন মেয়র কিছুটা হলেও।
দ্বিতীয় আঘাতটিও আসে একই চক্রের কাছ থেকে সুপরিকল্পিতভাবে। বিটুমিনের কাজ চলছে ষোলঘর রাস্তায়। মেয়র দাঁড়িয়ে থাকেন প্রতিদিন কাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। তবু এখানে দুর্নীতি আবিষ্কার করে ফেলে সাবেক চেয়ারম্যানের আমলের ‘পৌরপোষ্য সাংবাদিকচক্র’। তাদের কলমবাজী আর ক্যামেরাগিরির বদৌলতে ধোপাখালি রাস্তার খানাখন্দের ছবি এসে যুক্ত হয় ষোলঘর রামকৃষ্ণ আশ্রমের সম্মুখের রাস্তার নিউজে। ‘বস্তুনিষ্ঠ’ সাংবাদিকতা তো একেই বলে! পরবর্তীতে জগলুর গৃহিত পদক্ষেপে লেজ সোজা হয় ঐ চক্রের।
‘ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না’- আপ্ত বাক্যটি রপ্ত করেছিলেন তিনি খুবই ভালভাবে। যার ফলে পৌরসভার যেকোন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের আগে তিনি গুরুত্বারোপ করতেন ভবিষ্যতের লাভ-ক্ষতি কি হতে পারে তার ওপর। তিনি উদাহরণ টানতেন শহরের এক সময়ের খর¯্রােতা ‘কামারখাল’ দিয়ে। অপরিকল্পিতভাবে এর উৎসমুখ বন্ধ করেছিলেন এক সময়কার চেয়ারম্যান মেজর ইকবাল। পরবর্তীতে মউজদীন এসে বাঁধ ঘেঁষে নদীতে তৈরি করে ফেলেন পৌরসভা পরিচালিত একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিল্ডিং। উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজনে জগলুল এ শহরের প্রতি ইঞ্চি ভূমি চষে ফেলেছিলেন তাঁর প্রায় ৬ বছরের মেয়াদকালে। সে অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি প্রায়ই বলতেন, সুনামগঞ্জের বর্তমান জলাবদ্ধতার মূল কারণ কামারখালের অপরিকল্পিত ও বেআইনি বাঁধ। বাঁধ ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের মাধ্যমে খর¯্রােতা কামারখালকে তার হারানো যৌবন ফিরিয়ে না দিলে শহরের জলাবদ্ধতা দূর করা যাবে না কস্মিনকালেও। এরজন্য প্রয়োজন জেলা প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষের যৌথ অভিযান। আর তা হলেই কেবল দুর্বিষহ জলাবদ্ধতা থেকে পরিত্রাণ সম্ভব। জগলুল আজ নেই। তাঁর অবর্তমানে অন্য কেউ কি নেবেন কোনো উদ্যোগ? গ্রাহ্যের মধ্যে আনবেন কি পানিবন্দী শহরবাসীর দুঃখ-কষ্টের কথা?
২.
আজো জননেতা জগলুলকে নিয়ে দু-চারটা কথা লেখার মনস্থ করেছি। কিন্তু সমস্যা হয়ে উঠেছে তাঁর সাথে আমার দীর্ঘদিনের স¤পর্কের কারণে তৈরি হওয়া অগণিত স্মৃতি। মনের জানালাটিকে খোলা পেয়ে সব স্মৃতি যেন আজ চোখের সামনে এসে উড়াউড়ি শুরু করে দিয়েছে। সব স্মৃতি তো আর লেখা যায় না। তাই বাছাই করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
৯০ দশকের গোড়ার কথা। শহরের হাছননগরে যেখানে একসময় বিডিআর ক্যা¤প ছিল সে বাড়ির ধনাঢ্য মালিকের শিশুপুত্রের সঙ্গে প্রতিবেশী ঠেলাচালক আলেক্যার শিশুপুত্রের ঝগড়া হয়। টাকার গরমে ধনাঢ্য যান থানায়। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ এসে ঐ ঠেলাচালকসহ তার পরিবারের সব মহিলা ও শিশুকে ধরে নিয়ে যায় থানায় এবং সেখানে তাদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। এ ঘটনায় গর্জে উঠেন এ শহরের গরিবের একমাত্র কা-ারী আলফাত মোক্তার (মোক্তার সাব), সঙ্গে আয়ূব বখত জগলুল। শুরু হয় তৎকালীন ওসি মোহাম্মদ মহসিনের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগাম। ছোট মহকুমা শহরটি হয়ে যায় মিছিলের শহরে। এরই মধ্যে আসে কলেজ সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের দিন ভোটের বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। সুনামগঞ্জ পৌরসভার এক সময়ের ‘জননন্দিত চেয়ারম্যান’ তখন জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগের নেতা। ভোটের বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনায় ক্ষুব্ধ ওই নেতা চাদরের নিচে রিভলভার নিয়ে খুঁজতে থাকেন প্রতিপক্ষকে। অতঃপর ধরা পড়েন পুলিশের হাতে। ঘটনাটি চাউর হয়ে যায় গোটা শহরময়। রাষ্ট্র ক্ষমতায় তখন বিএনপি। ওই নেতার সব বড় ভাই তখন বিএনপি দলীয় এমপি। এমপি’র হস্তক্ষেপে ওসি মহসিন ছেড়ে দেন অস্ত্রসহ আটক ওই নেতাকে।
অস্ত্রসহ ধরা পড়া আসামিকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাটি ঠেলা চালক আলেক্যা পরিবারের ওপর চালানো নির্যাতনের প্রতিবাদে সংঘটিত আন্দোলনকে আরো বেগবান করে তুলে। মঞ্চে আবির্ভূত হই আমি এবং আমার বন্ধু রেজা- দুই সাংবাদিক। আন্দোলনের আগুনে ঘি পড়ে তখন। ফলশ্রুতিতে ঘটনা তদন্তে আসেন চট্টগ্রামের ডিআইজি। ওসি মোহাম্মদ মহসিনের কেলেঙ্কারিসহ নানা ঘটনা তুলে ধরি আমরা ডিআইজি’র কাছে। তিনি মনোযোগ দিয়ে শোনেন সব। হাতে নিয়ে যাচাই করেন আমাদের উপস্থাপিত প্রমাণপত্রাদি। আমার মনে আছে, আমি অস্ত্রসহ আটক ওই নেতার বেআইনি রিভলভারের নম্বরটি পর্যন্ত তুলে ধরেছিলাম ডিআইজি’র সামনে। ডিআইজি আমাদের আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, ঠিক আছে আপনারা লিখেন। যেদিন পত্রিকায় ছাপা হবে এর পরদিনই তার চাকরি থাকবে না।
আমি লিখেছিলাম ‘গণকণ্ঠ’-এ। আর রেজা দৈনিক কিষাণে। গণকণ্ঠ সংবাদটি ছাপেনি। অপরদিকে পুরো এক পাতাজুড়ে ফলাও করে সংবাদটি প্রকাশ করে ওসি মহসিনের লালবাতি জ্বালিয়ে দেয় ‘দৈনিক কিষাণ’। ফলশ্রুতিতে প্রথমে সাময়িক বরখাস্ত ও পরে চূড়ান্তভাবে চাকরি খোয়ান প্রবল প্রতাপশালী একই সঙ্গে টাকার উত্তাপে বেসামাল ওসি মোহাম্মদ মহসিন। বলে রাখা ভাল, তখনকার এসডিপিও’র কন্ট্রোলের বাইরে ছিলেন ওসি মোহাম্মদ মহসিন। বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলতেন সচরাচর। ডিআইজি’র সামনে তুলে ধরা ওসি মহসিনের কা-কীর্তির গাদা গাদা আমলনামা আমাদের হাতে আসতো কোন গুদাম থেকে, আশা করি, পাঠকের বুঝা হয়ে গেছে এরই মধ্যে।
সুনামগঞ্জের হোসন বখত চত্বরের অদূরে এক লন্ডন প্রবাসীর বাড়ি। তার বিল্ডিং ভেতরে পড়েছে পৌর রাস্তার বিপুল পরিমাণ ভূমি। ১৯৯৫ সালে উক্ত ভূমি উদ্ধারে পৌর কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে রণসাজে উপস্থিত হন তৎকালীন চেয়ারম্যান মউজদীন। কিন্তু সফলতা কপালে জুটেনি তাঁর। জগলুল মেয়র হওয়ার পর ভূমি জবর দখলে রাখার বিষয়টি নজরে আসে তাঁর। অতঃপর গ্রহণ করেন কার্যকরী উদ্যোগ। সফলতা এসে ধরা দেয় এতে। লন্ডনী পরিবারের দখলে থাকা পৌরভূমি মেয়র জগলুল উদ্ধার করে নিয়ে আসেন নির্বিবাদে। কেউ জানতেও পারলো না, বুঝতেও পারলো না। হঠাৎ একদিন দেখা গেল, এ বিল্ডিংটিতে ভাঙ্গার কাজ চলছে। তার কিছুদিন পর অবাক বিস্ময়ে শহরবাসী দেখলো, যে ভূমি উদ্ধার করতে রণসাজে সজ্জিত হয়ে এসেছিলেন মউজদীন এবং ফিরে গিয়েছিলেন পরাজিত সেনাপতির মতো, সে ভূমি জগলুর কাছে হস্তান্তরিত হয়ে গেছে কাক-পক্ষী জানার আগেই। হোসন বখত চত্বর থেকে বিহারী পয়েন্ট পর্যন্ত নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ও প্রশস্ত রাস্তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা ভাঙ্গা বাড়িটি আজও সে প্রমাণ বহন করে যাচ্ছে।
একদিনের কথা। পৌর চেয়ারম্যানের কাছে গিয়েছিলাম আমাদের বাসার সীমানা চিহ্নিত করার আবেদন নিয়ে। এ সময় পাশে এসে বসলো এক যুবক। তাকে চিনি আমি আগে থেকেই। জগলুর আপন ভাগ্নে সে। মেয়রের মায়ের জন্ম নিবন্ধন সনদ নিতে পৌরসভায় এসেছে সে। এক গাদা কাগজপত্রে সই করতে করতে হঠাৎ কলম থেমে গেল মেয়রের। বললেন, এর তো একটা ফি আছে। ভাগ্নে বললো, জ্বি মামা। মেয়র জানতে চাইলেন, টাকাটা কি দেওয়া হয়েছে। উত্তরটা জ্বি হওয়ায় রশিদটা দিতে বললেন মেয়র। ভাগ্নে বিপদে পড়ে গেলো। বললো, রশিদ তো আনিনি মামা, নিচে রয়ে গেছে। মেয়র রশিদ নিয়ে আসার কথা বললে ভাগ্নে প্রস্থান করে রুম থেকে। প্রায় ১০ মিনিট পর রশিদ এনে দিলে মেয়র সই করেন তাঁর মায়ের সনদে। আমার ধারণা, মেয়রের মায়ের সনদ বলে পৌর কর্মচারীরা প্রথমে হয়তো ফি রাখেনি। পরে অবস্থা বেগতিক দেখে রশিদ কাটতে বাধ্য হয়।
আরেকটি প্রসঙ্গ এর সঙ্গে প্রাসঙ্গিক। শহরবাসী পানির জন্য হাহাকারে। ওয়াটার সাপ্লাইয়ের পানি ধনাঢ্য ব্যক্তিরা নিজস্ব ট্যাংকিতে টেনে নিয়ে যেতো বড় বড় মোটর ব্যবহার করে। এ অবস্থায় পৌরবাসীকে কারবালার নিদারুণ কষ্ট থেকে রক্ষা করতে মেয়র জগলুলকে নামতে হয় অভিযানে। প্রথম দিনেই তিনি খুলে নিয়ে আসেন বেশ কয়েকটি মোটর। এরমধ্যে তার আপন ভগ্নিপতি সিরাজ মিয়ার মোটরটিও বাদ ছিল না। জগলুর মোটর ছিনিয়ে আনার ঘটনাটি হজম করা অনেকের কাছেই ছিল খুবই কষ্টকর।
এবার অন্য একটি প্রসঙ্গ। আদর্শ শিশু শিক্ষা নিকেতনের সাইন বোর্ড থেকে মউজদীনের নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। এ নাম বিষয়ে সুনামগঞ্জের বিপুল সংখ্যক জ্ঞানী, গুণী ও শিক্ষানুরাগী মানুষের সবিশেষ আপত্তি ছিল। সাপ্তাহিক স্বজন ও সাপ্তাহিক অনল- এ বিষয়টি নিয়ে বহু সংবাদ, মতামত এমনকি সাক্ষাৎকার পর্যন্ত ছাপা হয়েছিল। সবার বক্তব্যই ছিল মউজদীনের নাম ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়ে যুক্ত হওয়ার কোন যৌক্তিক কারণ নেই। নামটি এখানে খাপছাড়া। এরই মধ্যে আসে বেআইনিভাবে বিদ্যালয়ের চাকরি থেকে বাদ দেওয়া ৩ শিক্ষিকার মামলার রায়। হাইকোর্টের এ রায় নাম বহাল রাখায় পৌর কর্তৃপক্ষকে আদালত অবমাননার দ্বারপ্রান্তে উপনীত করে। ফলে পৌর পরিষদ বেছে নিতে বাধ্য হয় নাম অপসারণের পথ। যেদিন মউজদীনের নাম সম্বলিত সাইন বোর্ডটি নামানো হয় সেদিন ছিল শুক্রবার। এ সময় বিদ্যালয় আঙিনায় উপস্থিত ছিলাম। দু’তলা থেকে সাইন বোর্ডটি আছড়ে পড়ার পর যখন নতুন বোর্ড প্রতিস্থাপিত হয় তখন আমার আমি অনুভব করি এক অনাবিল আনন্দ। ভাবি আজ আমার জীবন ধন্য। সার্থক হয় আমার এতদিনকার পরিশ্রম। আমি যখন বিদ্যালয় আঙিনা পেরিয়ে রাস্তায় উঠি তখন আমার মুখ ছিল খুবই হাস্যোজ্জ্বল। এ চেহারায় আমাকে রাস্তায় দেখে বিপরীত দিক থেকে মোটর সাইকেলে আসা ¯েœহাস্পদ মাসুম হেলাল। সে জিজ্ঞেসই করে ফেলে আমাকে, কি ফোরকান ভাই আজ আপনাকে এত খুশি খুশি দেখাচ্ছে কেন? ঘটনাটি সংক্ষেপে বলে জবাব দিলাম আমি, হ্যাঁ, আজ আমি খুবই খুশি। জীবনে এতটুকু আনন্দ পাইনি আর কিছুতে কখনো।
আরো অসংখ্য স্মৃতিতে লেখার কলেবর আরো বড় করা সম্ভব। কিন্তু মন আজ আর সায় দিচ্ছে না। তাই আজকের মতো ইতি টানলাম এখানেই। (চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী