,

Notice :

বিশ্বকাপের বাঁশি – ২৭ : বিশ্বকাপের স্বাগতিকদের সাতকাহন ৫

মো. শাহাদত হোসেন ::
১৯৯৪ যুক্তরাষ্ট্র (১৫শ বিশ্বকাপ) :
ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফা ১৯৮৮ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রকে ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব দেয়। উত্তর আমেরিকা মহাদেশে এটাই প্রথম ও একমাত্র বিশ্বকাপ আয়োজন। আর্থিক দিক দিয়ে ব্যয়বহুল ও সফল এ বিশ্বকাপে দর্শক-উপস্থিতিও ছিল রেকর্ড পরিমাণ। গড়ে প্রতি ম্যাচে প্রায় ৬৯ হাজার দর্শক মাঠে বসে খেলা উপভোগ করেছে, যে রেকর্ড এখনো ছাড়াতে পারেনি আর কোন আয়োজক দেশ।
যুক্তরাষ্ট্রের ৯টি শহরের ৯টি স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ৫২টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। সবগুলো স্টেডিয়ামেরই ধারণক্ষমতা ছিল ৫৩ হাজারের উপরে। প্রায় ৩৬ লক্ষ মানুষ স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখেছে। ‘এ’ গ্রুপে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র সুইজারল্যান্ডের সাথে ড্র করে, কলম্বিয়াকে হারিয়ে দেয় এবং রুমানিয়ার সাথে হেরে যায়। তৃতীয় স্থানে থাকা চারটি দলের মধ্যে তৃতীয় হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে। রাউন্ড সিক্সটিনে ব্রাজিলের সাথে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় প্রথম বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জনকারী এবারের স্বাগতিকরা।
এ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা ৮টি দলের ৭টিই ছিল ইউরোপের, দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিনিধি ছিল শুধু ব্রাজিল। ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনালে ইউরোপের নেদারল্যান্ডকে, সেমিফাইনালে সুইডেনকে এবং ফাইনালে ইতালিকে হারিয়ে নিজেদের চতুর্থ বিশ্বকাপ জিতে।
কিন্তু এ বিশ্বকাপটি মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে অন্য কারণে। কেননা ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার শুরুটা হয়েছিল দারুণ। প্রথম ম্যাচে গ্রিসকে ৪-০ গোলে এবং দ্বিতীয় ম্যাচে ২-১ গোলে নাইজেরিয়াকে হারিয়েছিল। কিন্তু গ্রুপ পর্বের তৃতীয় ম্যাচটা ম্যারাডোনা আর খেলতে পারেনি। ড্রাগ টেস্টে পজেটিভ হওয়ায় তাঁকে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং ম্যারাডোনা-ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটে। ম্যারাডোনাবিহীন আর্জেন্টিনা দ্বিতীয় রাউন্ডে রোমানিয়ার কাছে হেরে বিশ্বকাপ মিশন শেষ করে। স্বপ্নের তৃতীয় বিশ্বকাপ আর জেতা হয়নি লা আলবিসেলেস্তেদের।
১৯৯৮ ফ্রান্স (১৬শ বিশ্বকাপ) :
এর আগে ফ্রান্স ১৯৩৮ বিশ্বকাপের আয়োজক ছিল। ৬০ বছর পর দ্বিতীয়বারের মত আয়োজক হল। মেক্সিকো ও ইতালির পর তৃতীয় দেশ হিসেবে এ সুযোগ পেল দেশটি। আয়োজক হওয়ার আগ্রহ ছিল সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ড ও মরক্কোরও। পরে সুইজারল্যান্ড ও ইংল্যান্ড আবেদন প্রত্যাহার করে নেয়। ফিফার চূড়ান্ত বাছাইয়ে মরক্কোর সাথে ১২-৭ ভোটের ব্যবধানে ফ্রান্স স্বাগতিক নির্বাচিত হয়। খেলা হয় ১০টি শহরের ১০টি স্টেডিয়ামে।
এ বিশ্বকাপ থেকেই ৩২ দলের খেলার প্রচলন শুরু হয় এবং এখন পর্যন্ত এটা অব্যাহত আছে। ৩২টি দল ৮টি গ্রুপে খেলে। আট গ্রুপের সেরা ২টি দল (মোট ১৬টি দল) যায় দ্বিতীয় রাউন্ডে। দ্বিতীয় রাউন্ড ‘রাউন্ড সিক্সটিন’ বা নকআউট পর্ব নামেও পরিচিত। দ্বিতীয় রাউন্ডে বিজয়ী ৮ দল কোয়ার্টার ফাইনালে এবং কোয়ার্টার ফাইনালের বিজয়ী ৪ দল সেমিফাইনাল খেলে। আবার সেমিফাইনালে বিজয়ী ২ দল ফাইনাল খেলে, পক্ষান্তরে পরাজিত ২ দল খেলে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ।
এ বিশ্বকাপেই অভিষেক হয় ফ্রান্সের স্বপ্নের নায়ক জিনেদিন জিদানের।
স্বাগতিক ফ্রান্স পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয়েই দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে। দ্বিতীয় রাউন্ডে প্যারাগুয়েকে ১-০ গোলে এবং কোয়ার্টার ফাইনালে টাইব্রেকারে ইতালিকে হারিয়ে সেমিফাইনালে আসে। সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে আর ফাইনালে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মত ট্রফি জিতে দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স। ফাইনালে ২ গোল করে জিনেদিন জিদান ফ্রান্সের নায়ক বনে যান।
আবার এ বিশ্বকাপেই চমক দেখায় নবাগত ক্রোয়েশিয়া। যুগোস্লাভিয়া ভেঙে স্বাধীন হওয়ার পর এ বিশ্বকাপেই প্রথমবারের মত মূল পর্বে সুযোগ পায় দেশটি। আর প্রথমবারেই বাজিমাত। সেবার প্রথম রাউন্ডে আর্জেন্টিনার কাছে হারলেও জাপান ও জ্যামাইকাকে হারিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে। দ্বিতীয় রাউন্ডে ১-০ গোলে রুমানিয়াকে এবং কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানিকে ৩-০ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে ডেভর সুকার। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ২-১ গোলে হারলেও নেদারল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করে। ডেভর সুকার ৬ গোল করে জিতে নেন গোল্ডেন বুট।
২০০২ কোরিয়া-জাপান (১৭শ বিশ্বকাপ) :
এই প্রথম এশিয়া মহাদেশের কোন দেশ এবং যৌথভাবে দুটি দেশ বিশ্বকাপের আয়োজক হল। ১৯৯৬ সালে ফিফার এক সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জাপানের ১০টি শহরের ১০টি স্টেডিয়ামে এবং দক্ষিণ কোয়িার ১০টি শহরের ১০টি স্টেডিয়ামে অর্থাৎ দু’দেশের কুড়িটি স্টেডিয়ামে খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হয়।
এ বিশ্বকাপের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স ও হট ফেভারিট আর্জেন্টিনার প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নেয়া ভুলার নয়। আর স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়ার চমকও ফুটবলপ্রেমীদের মন জয় করে নিয়েছিল। প্রথম রাউন্ডে দক্ষিণ কোরিয়া পোল্যান্ড ও পর্তুগালকে হারিয়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ড্র করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে। দ্বিতীয় রাউন্ডে ইতালিকে এবং কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনকে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে এশিয়ান টাইগাররা। সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে এবং পরের ম্যাচে তুরস্কের কাছে হেরে চতুর্থ হয়ে বিশ্বকাপের মিশন শেষ করে। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে এশিয়ার কোন দেশের এটাই সর্বোচ্চ সাফল্য।
অপর স্বাগতিক জাপান প্রথম রাউন্ডে রাশিয়া ও তিউনেশিয়াকে হারিয়ে এবং বেলজিয়ামের সাথে ড্র করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে চমক দেখিয়েই দ্বিতীয় রাউন্ডে আসে। কিন্তু দ্বিতীয় রাউন্ডে তুরস্কের সাথে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ে।
ফাইনালে ব্রাজিল ২-০ গোলে জার্মানিকে হারিয়ে তাদের পঞ্চম বিশ্বকাপ জিতে নেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী