,

Notice :

ত্যাগের তাৎপর্য ও বাস্তবতা : নাসরীন আক্তার খানম

প্রচণ্ড- গরম। দুপুরের তপ্ত রোদে তবুও জনজীবন থেমে নেই। এর উপর রোজার দিন। একটা রিকসা ডেকে তাতে উঠতে গিয়ে থমকে গেলাম। এত গরমে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। মনে হল এই লোকটি এত রোদে আমায় টেনে নিয়ে যাবে? বয়স ৩৫-এর মত হবে লোকটার। দরদর করে ঘামছে, মুখ মুচছে। আমি বললাম তুমি একটা মাথাল বা টেকো নিলেই পারতে, এতো রোদ তার উপর রোজা রেখে রিকসা টানছ, তোমার কষ্ট হবেতো! লোকটা হাসে। তারপর গায়ের ঘাম মুছে চট করে রিকসায় প্যাডেল চাপে। রোজা রাখতাম পারিনা, কষ্ট অয় হারাদিন রিকসা টানুন লাগে।
মেসে রান্না করে মর্জিনা। রোজার প্রচ- গরমেও চারটি মেসে সেহরি ও ইফতারি তৈরি করে দিতে হয়। রোজা রাখলে কষ্ট হয়। তাই চুপি চুপি দিনের বেলায় এটা-সেটা খেয়ে নেয়।
আসলাম সাহেব বিরাট বড় ব্যবসায়ী। রোজা মুখে সারাদিন ব্যবসা সামলান। বেশ কিছু কর্মচারীও আছে, যাদের সারাদিনই পিছু লেগে থেকে কাজ করাতে হয়। না হলে ফাঁকি দেয় খুব, সেজন্য মুখও খারাপ করতে হয়। আসলাম সাহেব রোজার মাঝেও ব্যবসায় অতিরিক্ত লাভ করার জন্য যা কিছু করার সবই করেন। কিন্তু বড়লোক আসলাম সাহেবের স্ত্রী ছেলেমেয়ে কেউ রোজা রাখেন না। রোজা এলে অদ্ভুতভাবে তার স্ত্রীর গ্যাস্ট্রিক ব্যাথা বেড়ে যায়।
আসলাম সাহেবের শালীর জামাইও বিরাট বড় আমলা। ঈদ উপলক্ষে তাদেরকে দেশের বাইরেই শপিংটা সারতে হয়। বিভিন্ন কাজের অবসরে মাঝে মাঝে রোজা রাখতে পারলেও নামাজ পড়া হয় না।
রোজার মাস সিয়াম সাধনার মাস। মুসলিম মাত্রই সিয়াম পালন করতে হবে যখন তার উপর এটা ফরজ হয়ে যাবে। কিন্তু সত্যি বলতে কি মধ্যবিত্ত একটা বিশাল শ্রেণি নামাজ-রোজার প্রতি যেভাবে মনোযোগী, নি¤œবিত্ত ও উচ্চবিত্ত কিন্তু সেভাবে নয়। অবশ্য সমাজে মানুষে মানুষে বিত্ত অনুযায়ী শ্রেণি বিভাজনটা আরও বেড়ে গেছে। দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর যখন পবিত্র ঈদুল ফিতর আসে তখন চোখে পড়ে আরও সব বিচিত্র সব চিত্রাবলী। যারা ঈদের শপিং শুরু করে রোজার প্রথম থেকে, আর শপিং করার জন্যই রোজা রাখার সময় পায়না, তারা কি বিচিত্র আনন্দে উল্লাসে মেতে উঠে।
টিভি চ্যানেলগুলো ঈদের অনুষ্ঠানের নামে অপসংস্কৃতির জোয়ারে গা ভাসিয়ে দেয়। ঈদুল ফিতরে ফিতরা দেওয়া হয়, যাকাত দেয়া হয়। যাকাতের দেবার নাম করে চলে নিজস্ব নাম প্রচারের বীভৎস্য দাম্ভিকতা। আর তার তলে পিষ্ট হয় কত হতদরিদ্র। এদেশে এখন চাকচিক্যময়, টাইলস খচিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তৈরির হিড়িক চলছে। কিন্তু যে হারে মসজিদ গড়ে উঠছে, নামাজের জামাতে সেরকম লোক কই। অন্তরে ভক্তি না থাকলে বাইরের চাকচিক্য দিয়ে কি হবে? অথচ আজ এসবই চলছে, প্রকট প্রচার সর্বস্ব ধর্মপালন করে অনেকে।
বেশ ক’বছর ধরে ঈদ পালনে নতুন এক সংস্কৃতি যুক্ত হয়েছে। যারা সামর্থ্যবান তারা চলে যায় কক্সবাজারে ঈদ উদযাপন করতে। নাড়ীর টানে গ্রামে এসে ঈদ পালনের সংস্কৃতিটাও বুঝি আমরা হারাতে যাচ্ছি।
এই যে এতক্ষণ যাবৎ বকবক করে যাচ্ছি, কেন তার নিশ্চয়ই একটা উদ্দেশ্য আছে।
প্রত্যেক ধর্মেই শান্তির বাণী নিহিত, মানুষকে ভালবাসা এবং তার সাথে সংযম পালনের কিছু বিধিবদ্ধ নিয়মও আছে। কাজেই যত কষ্টই হোক রোজা যেহেতু ফরজ রোজা রাখতেই হবে একজন মুসলিমকে। প্রয়োজনে রোজার সময় তার মজুরি বাড়–ক, কম শ্রম দিক। কিন্তু রোজা তাকে রাখতে দেবার মত ধর্মবান মুসলিম তো আমরা এখনও হইনি। আমরা এখনও এমন মুসলিম হয়নি যে সৎ ব্যবসা করব, সৎভাবে চাকরি করব। যে ধর্ম পালন আমাকে পরিবর্তিত করতে সাহায্য করছে না, আমার অন্তরে বিন্দুমাত্র ত্যাগের বীজ বপন করছেনা বরং তা প্রচার ও প্রদর্শন সর্বস্ব হয়ে যাচ্ছে তা কি আল্লাহ গ্রহণ করবেন!
যার আছে সে দু’হাতে খরচ করেও কুলিয়ে উঠতে পারছেনা, আর যার নেই সে নীরবে অশ্রু ঝরাচ্ছে ভোগ বিলাসিতার সামর্থ্য নেই বলে। কিন্তু কেউই সিয়াম এর তাৎপর্য্য, ঈদের তাৎপর্য্য বুঝতে সচেষ্ট নয়।
বংশানুক্রমিক ধারার মত রোজার ধারাও মুসলিমদের মাঝে বাহিত হচ্ছে, পালিত হচ্ছে কিন্তু এর প্রকৃত মহিমা, এর প্রকৃত শিক্ষা কি তার বুঝতে চাইওনা বা আমাদের অবসরও নেই। অথচ আমাদের ত্যাগের মহিমা, সৎ পথে নিড়াম্বর জীবন পালন ও সংযমী হবার শিক্ষা দানের জন্যই রোজা তথা সিয়াম সাধনা ও এরপরেই পবিত্র ঈদুল ফিতর পালন।
ভেবে দেখিনা, দুনিয়ার মোহ মায়ায় মত্ত হয়ে ভুলে যাই সব, ভুলে যাই একটু পরেই ফিরে যেতে হবে সেই মাটির ঘরেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী