,

Notice :

মাদকবিরোধী অভিযান : শর্ষের ভূতকে তাড়াতেই হবে

চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে নিহতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। আসক (আইন ও সালিশ কেন্দ্র) গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছে। আসকের উদ্বেগাক্রান্ত বিবৃতি প্রকাশের সময়ে নিহতের সংখ্যা ১৪৪ জন। এই উদ্বেগ প্রকাশকে অসঙ্গত বলার কোনও অবকাশ নেই, কোনও যুক্তিতেই। কিন্তু সেই সাথে সমাজের অভ্যন্তরে এই মাদক ব্যবসায়ীদের সমাজবিরোধী ভূমিকাটির কথা ভুলে গেলে চলবে না। দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে তাদেরকে ছাড় দিয়ে দেশের সর্বনাশ ডেকে আনারও কোনও অবকাশ আছে বলে মনে হয় না।
বেআইনিভাবে মাদক ব্যবসা চালিয়ে বিশেষ করে দেশের কর্মক্ষম যুবসমাজকে উৎপাদনবিমুখ করে দিয়ে দেশের উন্নয়নের চাকাকে স্থবির করে দেওয়ার আপদকে আমন্ত্রণ করাও কোনও যুক্তিতেই সুবুদ্ধির কাজ হবে না। এই আপদের স্বরূপটি একটু তলিয়ে দেখলে বোধোদয় হতে দেরি হয় না যে, মাদকাসক্তির কবলে পড়ে বিশেষ করে কিশোর-তরুণরা সন্ত্রাসী হয়ে উঠছে। স্বজনদের কাছে দুর্বিষহ দুর্ভোগের উৎস তো বটেই, এমনকি বর্তমান মুনাফামুখি সমাজবাস্তবতার জটিল পরিস্থিতিতে তারা সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার অন্যতম কারণ। এটা আজ আর কোনও গোপন বিষয় নয়। সকলেই জানে যে, বাংলাদেশের অগ্রগতিকে থামিয়ে দেওয়ার জন্যে দেশি-বিদেশি চক্রান্ত চলছে। আর সে চক্রান্ত বিশাল মাপের ও ভীষণ জটিলকূটিল। ইতোমধ্যে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাসঙ্কট বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, কর্মক্ষম জনশক্তিকে অকেজু করে দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে মাদকব্যবসাকে আগের যে-কোনও সময়ের তুলনায় হাজার গুণ বাড়িয়ে দিয়ে ও অপ্রতিরোধ্য করে তোলে। অর্থ খরচ করে মৃত্যুকে ক্রয় করতে বাধ্য করা হচ্ছে বাংলাদেশকে। অথচ বাংলাদেশের লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যে নিজেকে উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। মাদকব্যবসার ব্যাপক বিস্তার ও উন্নয়নের স্বপ্ন এক সঙ্গে চলতে পারে না। তদুপরি এই মাদকব্যবসা দেশের সার্বিক উন্নয়নকে থামিয়ে দেওয়ার আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের একটি অংশ। যেটাকে নিতান্ত মামুলি দৃষ্টিতে দেখার বা উপেক্ষা করার কোনও অবকাশ নেই।
মাদকব্যবসা প্রকৃতপ্রস্তাবে মাদকসেবীদেরকে সামগ্রিক ক্ষতির দিকে নয় কেবল, ইয়াবাসেবন মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং প্রকারান্তরে হাজার হাজার মানুষকে খুন করছে। চূড়ান্ত বিচারে মাদকব্যবসায়ীর প্রত্যেকে এক একজন ঠাণ্ডা মাথার ভয়ংকর খুনি। যে-কেউ এটাকে কেবল একটি অবৈধ ব্যবসা ভাবতে পারেন। কিন্তু এমন ভাবাটা সর্বার্থে ভুল হবে। ভুলে গেলে চলবে না যে, যে-মাদক গ্রহণের একমাত্র পরিণতি মৃত্যু, জেনেশুনে সে-মাদকের ব্যবসা করার একটাই মানে হতে পারে মানুষেকে নিশ্চিত খুন করে অর্থোপার্জন করা। তাছাড়া মাদকগ্রহণের পর গ্রহীতা এমন একটি মানুষে পরিণত হয়, যে-মানুষটা সমাজের কোনও কাজে লাগে না, বরং সামজের সমূহ ক্ষতি করতে করতে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। তার জীবন সকল প্রকার সামাজিক ও রাষ্ট্রিক অপরাধের সঙ্গে অনিবার্যভাবে ওতপ্রোত হয়ে পড়ে, মূর্তিমান সমাজবিরোধী সন্ত্রাসীতে পরিণত হয়। প্রত্যন্ত গ্রামের তরুণ মাদকের টাকা দিতে অস্বীকার করায় গর্ভধারিণী মাকে দা দিয়ে কোপাতে কসুর করছে না। সমাজে এমন একটি ব্যবসা কী করে চালু থাকে? সমাজ কী করে এই ক্ষতিকর ব্যবসাকে চালু রাখার অনুমোদন দিতে পারে? না কি এই সমাজটা আসলে মাদকব্যবসায়ীরাই পরিচালিত করে কিংবা তারাই এর প্রকৃত নিয়ন্ত্রক?
মাদকবিরোধী অভিযান দেশকে সুরক্ষিত করা কেবল নয়, প্রকারান্তরে দেশের যুবশক্তিকে রক্ষা করার একটি অপরিহার্য কার্যক্রম। এই কার্যক্রমে বাংলাদেশ ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে, কখনও বাস্তবের মুখ দেখবে না। মাদকবিরোধী অভিযানের বিরুদ্ধাচরণ করার অর্থ মাদকব্যবসায়ীদের পক্ষাবলম্বন করে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে যমদূতের হাতে সমর্পণ করা, খুনির হাতকে শক্তিশালী করা, দেশের উন্নয়নের বিরোধিতা করা। তাই এই অভিযান সকল মানুষের কাম্য। যে-কোনও মূল্যে এ অভিযানকে অব্যাহত রাখতে হবে, মাদকের সর্বনাশা বিস্তার সম্পূর্ণ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত। কিন্তু সেই সঙ্গে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার চর্চার বিষয়টি গুলিয়ে ফেললেও চলবে না, মনে রাখতে হবে যে মাদক বিরোধীরা কখনওই মানবাধিকার চর্চা করে না। তারা যে-মানবাধিকারকে হরণ করছে সেটাকে উদ্ধারের কার্যক্রম পরিচালনা এখন বেশি জরুরি। বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হতে দিতে না চাইলে এই মাদকবিরোধী অভিযান একটি নির্বিকল্প জাতীয় কর্তব্য।
পত্রপত্রিকার সংবাদে প্রকাশ, মাদকবিরোধী অভিযান চালানো হয় মাদকব্যবসায়ীদেরকে নিজস্ব আস্তানা থেকে পালিয়ে যাবার সুযাগ করে দিয়েছে। অথবা সমালোচনার তর্জনী উঠানো হচ্ছে এই বলে যে, বন্ধুকযুদ্ধের নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর মাধ্যমে পরিকল্পিত হত্যাকা- ঘটানো হচ্ছে। অস্বীকার করছি না। এমন হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুন তার জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত। এমনসব ঘটনা অপরাধজগতের কিংবা মাদকব্যবসার সর্বাস্তৃত সম্পৃক্তার একটি আলামত মাত্র। যা আসক কথিত ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত করা’র প্রতিবন্ধক। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তর ও প্রতিষ্ঠানের বিশেষ বিশেষ প্রতিনিধি অপরাধজগতের দালাল কিংবা নিয়ন্ত্রক এবং বাস্তবে মাদকব্যবসার সঙ্গে ওতপ্রোত, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তারা নির্বিঘেœ এই ব্যবসা করে যাবেন সমাজ ও রাষ্ট্রের সীমাহীন ক্ষতি করে এটা হতে পারে না। সার্বিক বিবেচনায় এই অবস্থা সৃষ্টির জন্য দায়ী বিদ্যমান আর্থসামাজিক বিন্যাস। এই বিন্যাসকে আমূল পরিবর্তিত করতে না পারলে শর্ষের মধ্যে ভূত থেকেই যাবে। শর্ষের মধ্যে ভূতকে রেখেই মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে যেতে হবে, শেষে শর্ষের ভূতকে তাড়ানোর জন্যেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী