,

Notice :
«» শাবিতে ভর্তি পরীক্ষায় ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে প্রথম হয়েছে শাহিলা চৌধুরী «» জগন্নাথপুরে প্রবাসীর উদ্যোগে রাস্তায় মাটি ভরাট «» স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রয়াত সভাপতি রমা দাসের জন্মদিন পালন «» সামাজিক সম্প্রীতি বিষয়ক কর্মশালা «» হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের বাদাঘাট দক্ষিণ ইউনিয়ন কমিটি গঠন «» ধর্মপাশায় পূজা মণ্ডপ পরিদর্শন করেন রনজিত সরকার «» কাজ-না-করা সরকারি প্রতিষ্ঠান দেশের উন্নতিকে পিছনে টানে «» পণ্য প্রদর্শনী মেলায় নিম্নমানের পণ্যের দাম অধিক «» তাহিরপুর-মধ্যনগরে ব্যারিস্টার ইমনের মতবিনিময়: নির্বাচনী এলাকায় নতুন আলোচনা «» শিক্ষক সংকটে দক্ষিণ সুনাগঞ্জের অধিকাংশ বিদ্যালয় ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম

মুক্তিযুদ্ধের সাংবাদিকতা – রণাঙ্গন ও সীমান্তে : হারুন হাবীব

মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন সাংবাদিকতার বিষয়টি একাধিক প্রেক্ষাপটে আলোচিত হবার দাবি রাখে। প্রথমত, একজন সাংবাদিক, দেশি-বিদেশি যে-কেউই হোন না কেন, পেশাগত কারণে কীভাবে এবং কী পরিস্থিতির মধ্যে সেদিন নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। সেদিক থেকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাংবাদিকতার ব্যাপ্তি অনেকÑ যা এ আলোচনার ব্যাপ্তি অনেকটাই বাড়িয়ে দেবে। কারণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাংবাদিকতা, অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে সে বছরের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যে সাংবাদিকতাÑ তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেশীয় সাংবাদিকদের হাতে হয়নি। হবার সংগত কারণও ছিল না। অবরুদ্ধ এবং যুদ্ধকালীন বাংলাদেশে বা পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ সাংবাদিকতার কাজটি যতটা না হয়েছে দেশীয় সাংবাদিকদের হাতে, তার চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে পরদেশী সংবাদজীবীদের হাতে। এমন পরিস্থিতির পেছনে যোগ্যতম কারণও ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র কর্মকা- কার্যত শুরু হয়েছে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাত থেকে, কিংবা বিচ্ছিন্নভাবে তারও আগে থেকে। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ঢাকা শহরে অতর্কিতে হামলা চালায় এবং পরিকল্পিতভাবে নির্বিচার বাঙালি নিধনযজ্ঞে লিপ্ত হয়। সেদিনই মধ্যরাতে, অর্থাৎ ২৬ মার্চ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেন। তখন থেকেই বিচ্ছিন্নভাবে হলেও, পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিরোধ-সংগ্রাম শুরু হয়। এ পরিস্থিতিতে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় দেশের সংবাদপত্র। ২৬ মার্চ কোনো সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়নি। পাকিস্তানের সামরিক শাসকরাও বসে থাকে নি। তারা ঢাকা থেকে প্রকাশিত ইত্তেফাক, আজাদ, পূর্বদেশ, দৈনিক পাকিস্তান, পাকিস্তান অবজারভার, মর্নিং নিউজসহ অন্যান্য পত্রিকাগুলোকে বন্দুকের জোরে পুনঃপ্রকাশ করতে বাধ্য করে। সামরিক জান্তা বিশ্ববাসীর সামনে এটিই প্রমাণ করতে চেষ্টা করে যে, পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি স্বাভাবিক, সব কিছু তাদের নিয়ন্ত্রণে। সেনাশাসকরা এরপর কঠোর ‘সেন্সরশিপ’ আরোপ করে সংবাদপত্রের কণ্ঠ রোধ করে, যাতে তাদের নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ এবং উৎপীড়নের ঘটনাগুলো লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যায়।
ভাবতে আজ অনেকটাই অস্বাভাবিক মনে হতে পারে, কিন্তু ২৬ মার্চ, ১৯৭১ থেকে সেদিনের পূর্ব পাকিস্তানের কোনো খবরের কাগজই মুক্তিযুদ্ধ কিংবা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হত্যা-নিপীড়নের খবর ছাপতে পারে নি। বন্দুকের মুখে তারা সংবাদপত্রগুলোকে সরকারি খবর ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সেনা-সরকারের মনোভাব প্রচার করতে বাধ্য করে। এ ধরনের ঞৎঁঃয ইষধপশড়ঁঃ চলে ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ পর্যন্ত। অথচ সেদিনের পূর্ব পাকিস্তান বা আজকের বাংলাদেশের এই পত্রিকাগুলোই ২৫ মার্চ পর্যন্ত দুঃসাহসে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে সমর্থন জুগিয়েছে। ইত্তেফাক, সংবাদ, পূর্বদেশ, দৈনিক পাকিস্তান, গণবাংলা, দি পিপল, আজাদ এবং পাকিস্তান অবজারভার ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের পক্ষে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে। ষাটের দশকের সাহসী সে সাংবাদিকতা, আমাদের পুরোধা সাংবাদিকদের সে দেশপ্রেম, সাহস ও প্রজ্ঞা প্রদর্শিত না হলে মুক্তিযুদ্ধের জন্য এই মাটি এত দ্রুত তৈরি হতো কিনা সন্দেহ। বলাই বাহুল্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালির আপসহীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। মুক্তিযুদ্ধের পুরো ৯ মাসে গোটা পূর্ব পাকিস্তান ছিল রক্তাক্ত, অবরুদ্ধ এক ভূখ-। অবরুদ্ধ এই ভূখ-র প্রতিটি সংবাদপত্র কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো পাকিস্তানের সামরিক শাসক কিংবা গণহত্যায় মত্ত দখলদার বাহিনীর হাতে। প্রধান দৈনিক ‘ইত্তেফাক’ এবং ‘সংবাদ’, সেই সাথে ইংরেজি ‘দি পিপল’ এবং ‘গণবাংলা’র অফিসগুলোকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আগুন দিয়ে ভস্মীভূত করে। কারণ একদিকে এরা ছিল বাঙালি মালিকানায়, অন্যদিকে ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জোরদার সমর্থক। ‘সংবাদ’ অফিসে পাকিস্তানিদের দেয়া আগুনে মারা গেছেন প্রগতিশীল লেখক ও সাংবাদিক শহীদ সাবের। শুধু তাই নয়, একই সাথে পাকিস্তানিরা হামলা চালিয়েছে পূর্বদেশ এবং পাকিস্তান অবজারভার অফিসে। বন্ধ হয়ে গেছে ফয়েজ আহমদ স¤পাদিত ‘স্বরাজ’, আব্দুল গাফফার চৌধুরী স¤পাদিত ‘আওয়াজ’ এবং শেখ ফজলুল হক মণি স¤পাদিত ‘বাংলার বাণী’। অসাম্প্রদায়িক বুদ্ধিজীবী শ্রেণি, বিশেষত সংবাদপত্র জগতের মধ্যমণি যারা, তারা গোড়া থেকেই পাকিস্তানি শাসকদের প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। অতএব পত্রিকা চালাবার মতো নিরাপত্তা বা স্বাধীনতা ছিল না সাংবাদিক ও পত্রিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের।
আগেই বলেছি, ২৫ মার্চের ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বা সর্বাত্মক সামরিক অভিযানের পর দিন থেকে আমাদের বেশির ভাগ সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে যায়। এরপর যেগুলো বেরিয়েছে তারা পক্ষান্তরে হয় পাকিস্তানিদের জয়গান করতে বাধ্য হয়েছে নয়তো যেনতেনভাবে দায়িত্ব পালন করেছে। সাংবাদিকদের মধ্যে বেশির ভাগ হয় আত্মগোপন করেছিলেন, নয়তো সীমান্তের পথে যাত্রা করেছিলেন। কাজেই মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের হাতে বাঙালি নিধনযজ্ঞ, হানাদারদের হাতে নিরন্তর মানবাধিকার লঙ্ঘন, গণহারে লুণ্ঠন, নারী ধর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞ, কিংবা স্বাধীনতাকামীদের সশস্ত্র তৎপরতার খবরগুলো প্রচারের বিন্দুমাত্র সুযোগ ছিল না দেশীয় সাংবাদিকদের। বিপন্ন সংবাদপত্রের পাতাগুলো তখন হত্যাকারীদের বয়ানে মনগড়া ইসলাম, ধর্মের রামাবলি গায়ে পাকিস্তানের অখ-তা রক্ষা, শেখ মুজিবুর রহমান আর সেই সাথে ভারতের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতেই ব্যস্ত ছিল। সামরিক কর্তৃপক্ষের কঠোর সেন্সরসিপ ও জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে কিছু কিছু পত্রিকা চালু রাখা হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য এর ব্যত্যয়ও ঘটে। বাঙালি হয়েও কেউ কেউ আবার পাকিস্তানিদের সমর্থক হয়। জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র ‘দৈনিক সংগ্রাম’ মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে পাকিস্তানিদের মূল পত্রিকা হিসেবে কাজ করে।
এখানে একটি কথা বলে রাখা উচিত, মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানিদের চাপে ঢাকা বা অন্যান্য জায়গা থেকে যেসব পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল তাদের বেশির ভাগই পাকিস্তানি প্রশস্তির ফাঁকে সুকৌশলে মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক তৎপরতার খবরগুলো প্রচার করত। এ ছিল দেশপ্রেমের এক অনন্য নজির। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে কোথাও কোনো আক্রমণ ঘটলে কিংবা হানাদার বাহিনী কোথাও আক্রান্ত হলে খবরগুলো পরিবেশন করা হতো বেশ কৌশল করে। ঘটনার বয়ান দিয়ে সংবাদপত্রগুলো ‘সশস্ত্র দুষ্কৃতকারীদের’ কিংবা ‘ভারতীয় চরদের’ হাতে ‘অন্তর্ঘাতমূলক’ কর্মকা-ের কথা বিস্তারিত লিখত। এতে দেশবাসীর জানতে অসুবিধে হতো না যে মুক্তিযোদ্ধারা সক্রিয় হয়েছে, সীমান্ত অঞ্চলে তারা সংগঠিত হচ্ছে এবং পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে ক্রমান্বয়েই জোর প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে উঠছে। এদিক থেকে মুক্তিযুদ্ধের সাংবাদিকতায় দেশীয় সংবাদপত্রের একটি পরোক্ষ ভূমিকা অনস্বীকার্য।
সেদিন অবরুদ্ধ বাংলাদেশের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের খবর বিশ্বজুড়ে প্রচারের ক্ষেত্রে বেশি অবদান রেখেছিল ভারত, ইংল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ফ্রান্স, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রধান প্রধান সংবাদপত্র এবং বেতার-টেলিভিশনগুলো। চীন, আরব দুনিয়ার পত্রিকাগুলো ছিল পাকিস্তানি স্বার্থের শক্ত সমর্থক। ১৯৭১-এর ঘটনাপ্রবাহে নিক্সন প্রশাসন যদিও পাকিস্তান সরকারের পক্ষ অবলম্বন করেছিল, তথাপি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সংবাদপত্র, বুদ্ধিজীবী শ্রেণি এবং বেতার-টেলিভিশনগুলো পাকিস্তানি গণহত্যার শক্ত সমালোচক হয়ে উঠেছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতীয় সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে বেশি অবদান রাখে কলকাতার ‘যুগান্তর’, ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’, ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ এবং ‘স্টেটসম্যান’, নতুন দিল্লির ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’, ‘পাইওনিয়ার’, ‘হেরাল্ড’, ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ এবং সেদিনের মাদ্রাজ বা আজকের চেন্নাই-এর প্রভাবশালী ‘দি হিন্দু’ পত্রিকা। এ ছাড়াও ছিল বম্বের ‘ব্লিৎস’, কলকাতার ‘দেশ’সহ অন্যান্য ভারতীয় সাময়িকী। সত্তরের ঐতিহাসিক নির্বাচন-পরবর্তী থেকে মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় এসব প্রধান ভারতীয় পত্রিকা বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, মুক্তিবাহিনী এবং প্রবাসী মুজিবনগর সরকারকে সর্বাত্মক সমর্থন জুগিয়ে গেছে। ‘আকাশবাণী’ কলকাতা কেন্দ্রের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। অন্যদিকে লন্ডনের বিবিসি পালন করেছে অসামান্য এক ভূমিকা। এমন কোনোদিন নেই বিবিসি বাংলাদেশের গণহত্যা, মুক্তিযুদ্ধ কর্মকা- ও পাকিস্তানি নানা পদক্ষেপ নিয়ে সংবাদ ও পর্যালোচনা প্রচার করেনি। গণমাধ্যমের এই নিরবচ্ছিন্ন সমর্থনের কারণে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি বিশ্ব সমর্থনের একটি শক্ত ভীত তৈরি হয়েছিল।
পশ্চিমা বিশ্বের খ্যাতিমান যে কাগজগুলো পাকিস্তানি বর্বরতাকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে আমাদের সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষে বিশ্বজোড়া সমর্থন গড়ে তুলেছিল, তাদের প্রধানতম ইংল্যান্ডের ‘সানডে টাইমস’, ‘অবজারভার’, ‘গার্ডিয়ান’, ‘টেলিগ্রাফ’ এবং ‘ইকনোমিস্ট’; যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’, ‘নিউইয়র্ক টাইমস’, ‘ক্রিশচিয়ান সায়েন্স মনিটর’ এবং ‘টাইম’ ও ‘নিউজউইক’ ম্যাগাজিন।
‘ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন’-এর কথাও উল্লেখ করা যেতে পারে। উল্লেখ করা যেতে পারে, ফ্রান্সের ‘লা-মন্ড’সহ জার্মানি-ইটালির বিশিষ্ট দৈনিক ও সাময়িকীগুলোর ভূমিকার কথা ।
যদিও মার্কিন সরকার মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, এমনকি ‘সেভেন্থ ফ্লিট’ পর্যন্ত পাঠিয়েছে, কিন্তু মার্কিন গণমাধ্যমে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে গণহত্যা, ভারত সীমান্ত অঞ্চলে প্রায় ১ কোটি শরণার্থীর দুঃখ-দুর্দশার খবর বিশ্ব জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
মুক্তিযুদ্ধের সাংবাদিকতার অন্য একটি দিকও উল্লেখ করা যেতে পারে। সেটি অবশ্য যুদ্ধের মাঠপর্যায়ের, রণাঙ্গনের। সীমান্তবর্তী বিভিন্ন মুক্তাঞ্চল আর ভারতীয় এলাকাগুলো থেকে নানা পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমেও সাংবাদিকতার দুরূহ কাজটি করা হয়েছে সে সময়। আমার বিশ্বাস, আমাদের প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্রগুলো নিরাপত্তাজনিত কারণে যে কাজটি পারে নি বা যা তাদের পক্ষে করা সম্ভব হয় নি, সে দায়িত্বটি পালন করেছে সীমান্ত অঞ্চলের ক্ষুদ্র এবং অনিয়মিত এই প্রকাশনাগুলো। এ কাজটি ছিল আমাদের মুক্তিসংগ্রামে নিষ্ঠাবান সহযোগীর কাজ, যা স্বাধীনতাকামীদের মনোবল বাড়িয়েছে, বিশ্ববাসীর সামনে বাঙালিকে আরেকবার আধুনিক জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বলে রাখি, আমার এ লেখাটি মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন সাংবাদিকতার ক্ষুদ্র পরিসর একটি আলোচনা মাত্র। এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ, তথ্যসমৃদ্ধ বিবরণ লিপিবদ্ধ করা সময়সাধ্য গবেষণার কাজ। আমি শুধু আমার সীমিত অভিজ্ঞতার আলোকে এ লেখাটি লিখছি। প্রাসঙ্গিক বলেই এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ সম্ভব হয়েছে একটি দীর্ঘ ধারাবাহিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ফলে এবং তা পরিচালিত হয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্বে যাতে গোটা জাতি অংশগ্রহণ ছিল। কোনো জাতির মুক্তিযুদ্ধের মতো বিশাল-ব্যাপক জনযুদ্ধ কখনোই নিছক সামরিক কর্মকাণ্ড হয় না, হতে পারে না।
মুক্তিযুদ্ধ কোনো সাধারণ যুদ্ধ বা ‘কনভেনশনাল ওয়ার’ নয়, কোনো ফুটবল ম্যাচও নয়, যা কোনো ঘোষণা দিয়েই শুরু বা শেষ করা যেতে পারে। যদিও ১৯৭৫-এর রক্তাক্ত পালাবদলের পর অনেকটা পরিকল্পিতভাবে একাত্তরের ঘটনা প্রবাহকে নিছক সামরিক কর্মকা- বলে চালাবার চেষ্টা হয়েছে, চেষ্টা হয়েছে স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাসকে বিকৃত করার, কিন্তু ইতিহাস তার নিজের সত্য নিয়েই বেঁচে থাকবে বলে আমি বিশ্বাস করি। সফল একটি যুদ্ধ পরিচালনা করতে সমরাস্ত্র যেমন প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন যুদ্ধকালীন প্রচারযন্ত্রের। যুদ্ধের সময় ‘ইনফরমেশন’ এবং ‘মোটিভেশন’ তাই এক গুরুত্বপর্ণূ কাজ। এগুলো কেবল বাইরের জন্যই প্রয়োজন তা নয়, প্রয়োজন যুদ্ধরত মুক্তিবাহিনীর মনোবল রক্ষার্থেও। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যেখানে জাতীয় স্বাধীনতার লক্ষ্যে জনযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে সেখানেই এ কাজগুলোকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা হয়েছে। আমাদের জন্য সুখবরটি হচ্ছে এই, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব সেটি জানতেন। সে কারণে মুজিবনগর সরকারের নিয়ন্ত্রণে পুরোদমে কাজ শুরু করেছিল ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ যা হয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রধানতম প্রচারযন্ত্র। মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকারের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল বলেই ভারতীয় ভূখ- থেকে বাংলাদেশের একটি বেতার কেন্দ্র চালানো সম্ভব হয়েছিল। এ বেতার কেন্দ্রের প্রথম সম্প্রচার ঘটে চট্টগ্রামে এবং আগরতলা হয়ে কলকাতায় যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত সফলভাবে তা পরিচালনা করেন আমাদেরই আত্মত্যাগী কিছু শব্দসৈনিক এবং সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মুজিবনগর সরকারের হাতে নিয়মিত প্রকাশিত হয় ‘জয় বাংলা’ সাপ্তাহিক যা ছিল যুদ্ধকালীন সরকারের মুখপত্র।
আমার সৌভাগ্য হয়েছিল প্রবাসী সরকারের এ দুটি গণমাধ্যমের সাথে রণাঙ্গন থেকে একজন যুদ্ধ-সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করার। এই স¤পৃক্ততা, প্রথমত, কিছুদিনের জন্য ‘জেড ফোর্স’ এবং পরে উত্তর-ময়মনসিংহের ‘১১ নম্বর সেক্টর’ থেকে যা ছিল আমার স্মৃতির রণাঙ্গন। মুক্তিযুদ্ধে মূলত একজন গেরিলাযোদ্ধা হিসেবে অংশগ্রহণ করেও যুদ্ধকালীন সাংবাদিকতার সাথে আমার যে যোগ তা ব্যক্তি-জীবনের এক বড় অধ্যায়। মেঘালয়ের পাহাড় থেকে আসাম হয়ে ত্রিপুরা পর্যন্ত চলতে হয়েছে আমাকে বহুবার যুদ্ধের খবর সংগ্রহ করতে। রণাঙ্গন থেকে রণাঙ্গনে ঘুরে যুদ্ধের খবর সংগ্রহ করতে হয়েছে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ আর ‘জয় বাংলা’ পত্রিকার জন্য। প্রচারপত্র লিখতে হয়েছে একের পর এক, ছাপিয়ে আনতে হয়েছে সেগুলো দূর-দূরান্ত, এমনকি আসামের গৌহাটি থেকে। একদিকে ময়মনসিংহ এবং বৃহত্তর রংপুর নিয়ে ১১ নম্বর সেক্টরের প্রাণকেন্দ্র মহেন্দ্রগঞ্জ, মানকারচর, ডালু, পুরাকাসিয়া অন্যদিকে আসাম-মেঘালয়ের সীমান্তে তেলঢালায় ‘জেড ফোর্স’ হেড কোয়াটার্স, একই সাথে পাহাড়ি সীমান্তের শিবিরগুলোতে অবস্থানরত শরণার্থী এবং মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতিবিদ এদের অনেকের সঙ্গেই দিনের পর দিন যোগাযোগ রাখতে হয়েছে আমাকে সাংবাদিকতার তাগিদে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের এমএ শেষ পর্বের ছাত্র আমি তখন। কাগজে সবেমাত্র লিখতে শুরু করেছি। সেদিনকার এপিপির প্রতিনিধি হয়েছি আমার নিজের জেলা (তখনকার মহকুমা) জামালপুরের। অতএব সে সুবাদে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের যৎকিঞ্চিৎ সাংবাদিকতা করার ঐতিহাসিক সুযোগটুকু আমি গ্রহণ করেছিলাম। হয়তো এটিও সত্যি যে, জাতির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একজন গেরিলাযোদ্ধা হয়েও সাংবাদিকতা করার বিধিলিপি ছিল আমার।
‘জয় বাংলা’ পত্রিকাটির স¤পাদক ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা ও এমএনএ জনাব আব্দুল মান্নান, যদিও পত্রিকায় তার নাম লেখা হতো ‘আহমদ রফিক’। তিনি প্রবাসী সরকারের তথ্য বিভাগের প্রধান হিসেবে এ দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কাগজটি ছাপা হতো কলকাতা থেকে এবং বিতরণ করা হতো যুদ্ধরত বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে। ‘জয় বাংলা’য় একদিকে যেমন থাকত যুদ্ধের প্রচারধর্মী খবর ও সংবাদ পর্যালোচনা, থাকত প্রবন্ধ, কবিতা এবং যুদ্ধ-পরিস্থিতির মূল্যায়ন; অন্যদিকে ছাপা হতো পাকিস্তানিদের গণহত্যার খবর, নির্যাতন এবং দেশ-বিদেশে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থনের সংবাদ।
মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝ থেকে বিভিন্ন রণাঙ্গনে এর কিছু প্রতিনিধিও নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। খবর সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সেক্টর কমান্ডারের অফিস, মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থী শিবির, মুজিবনগর সরকার, কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম, ভারতীয় বিএসএফের জনসংযোগ বিভাগ ইত্যাদি ছিল ‘জয় বাংলা’র মূল সংবাদসূত্র। এছাড়াও বিবিসি, আকাশবাণী, ভয়েস অব আমেরিকা এবং রেডিও অস্ট্রেলিয়া থেকে খবর নেয়া হতো।
আমার হাতে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে পর্যায়ক্রমে দুটি ক্যামেরা আসে। একজন আলোকচিত্রী না হয়েও সে কারণে মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাসের বহু ছবি আমার ক্যামেরায় বন্দী হয়ে আছে। শুধু প্রিয় স্টেনগানটিই নয়, একই সাথে কলম ও ক্যামেরা ছিল আমার মুক্তিযুদ্ধের প্রিয় সহচর।
আগেই উল্লেখ করেছি, প্রবাসী সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের বাইরেও প্রায় সীমান্তজুড়ে, বিশেষত ভারত সীমান্তের ছোট ছোট শহর থেকে অসংখ্য পত্রিকা বেরিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে। এই কাগজগুলোর বেশির ভাগই নিয়মিত ছিল না, আকার প্রকারেও উঁচুমানের কিছু ছিল না। কিন্তু আমি বলতে বাধ্য, এই প্রকাশনাগুলো মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান করেছে। এগুলোর সাথে, স্বীকার করতেই হবে, সীমান্তের ওপারের বাঙালি বুদ্ধিজীবী শ্রেণি এবং ভারতীয় বাঙালি বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, প্রেস মালিক আর অর্থ জোগানদাতাদের অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সৌভাগ্য ছিল যে, আমরা ভারতীয় সীমান্তের প্রতিটি অঞ্চলে বাংলাভাষী জনসংখ্যার অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছিলামÑ যারা তাদের প্রাণের সবটুকু আবেগ আর সততা দিয়ে আমাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল।
আরও উল্লেখ করার মতো যে, এই বাংলাভাষীরা বেশির ভাগই ছিল আবার পূর্ববাংলা থেকে ছিটকেপড়া ১৯৪৭-এর হতভাগ্য দেশত্যাগী মানুষ। ইতিহাসের এও এক তাৎপর্যময় অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠক মাত্রেই জানবেন, ক্ষুদ্র ভারতীয় রাজ্য ত্রিপুরা ১৯৭১ সালে হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। কলকাতা যদিও ছিল রাজনৈতিক কেন্দ্র, আগরতলা ছিল সমর রাজধানী এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই তা সম্ভব হয়েছিল। বিশ্বের সংবাদপত্রগুলোর কাছে আগরতলা হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান ‘ডেটলাইন’।
যে ত্রিপুরার মোট জনসংখ্যা ছিল ১৫ লাখের মতো, সেই ত্রিপুরাকে ঠাঁই দিতে হয়েছিল সেদিন ১৪ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি শরণার্থী। ত্রিপুরায় সেদিনের মূল পত্রিকা ছিল ‘দৈনিক সংবাদ’ যার সম্পাদক ছিলেন ভূপেন দত্ত ভৌমিক (কয়েক বছর আগে ভূপেন দত্ত মারা গেছেন)। ত্রিপুরার এ কাগজটি সেদিন সকল অর্থেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান দৈনিকে রূপান্তরিত হয়েছিল। অন্যদিকে ‘সাপ্তাহিক সমাচার’ নামে আরও একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন নিবেদিতপ্রাণ বাঙালি অনিল ভট্টাচার্য। ট্যাবলয়েড সাইজের এ কাগজটিও ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রকাশ্য সমর্থক। ত্রিপুরার অন্য কাগজগুলোর মধ্যে ‘জাগরণ’ এবং সিপিআই (এমএল)-এর মুখপত্র ‘দেশের কথা’ মুক্তিযুদ্ধে বড় ভূমিকা রেখেছে।
এছাড়াও হয়তোবা শুধু বাঙালি হবার কারণেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, রণাঙ্গনের রিপোর্টিংয়ে বেশ কয়েকজন ভারতীয় সাংবাদিক নিবেদিতপ্রাণ হয়েছিলেন। এদের মধ্যে আজ যাদের কথা মনে করতে পারছি, তারা হচ্ছেন স্টেটসম্যানের অমূল্য গাঙ্গুলি, অশেষ চক্রবর্তী এবং মনোজ মিত্র, আনন্দবাজার-এর অসীম দেবরায় এবং তুষার প-িত, যুগান্তর-এর অনিল ভট্টাচার্য (সিনিয়র) এবং আগরতলার অনিল ভট্টাচার্য, টাইমস অব ইন্ডিয়া’র সুভাস মুখার্জি, পিটিআই-এর মানিক চৌধুরী, মধুসূদন গুহ রায়, আকাশবাণীর সনৎ মুখার্জি এবং ইউএনআই থেকে কে কে চাড্ডা। এদের বাইরেও অসংখ্য ভারতীয় সাংবাদিক আমাদের মুক্তিযুদ্ধের খবর সংগ্রহ করে তাদের নিজস্ব মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন।
তবে পশ্চিমী সাংবাদিকদের মধ্যে সাইমন ড্রিং, কলিন স্মিথ, আরনল্ড জেটলিন, ডেন কগিন, সিডনি সেনবার্গ, সিরিল জন, আলোকচিত্রী মিশেল রবার্ট, লুই হেরেন, নিকলাস টমালিন, পিটার আর হেনরিস এবং এন্থনি ম্যাসকারনহাসের কথা আমাদের সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করতে হবে।
এখানে দু’জন ভারতীয় সাংবাদিকের কথা আমি উল্লেখ করতে চাই যারা অবরুদ্ধ বাংলাদেশের খবর সংগ্রহ করতে এসে আর কখনও ঘরে ফিরে যাননি। এ দুই তরুণ ভারতীয় সাংবাদিকের একজন সুরজিৎ ঘোষাল আর অন্যজন দীপক ব্যানার্জি। বেনাপোল হয়ে এরা দু’জন যুদ্ধরত বাংলাদেশে নিজেদের পরিচয় গোপন করে প্রবেশ করেছিলেন গণহত্যার খবর সংগ্রহ করতে। আগরতলার খ্যাত আলোকচিত্রী রবীন সেনগুপ্ত এবং প্রবীণ সাংবাদিক অনিল ভট্টাচার্য আমাকে জানিয়েছেন, এই দুই ভারতীয় সাংবাদিক ২৪ মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে ঘুরে পাকিস্তান বাহিনীর বিভিন্ন অত্যাচারের ছবি ও খবর সংগ্রহ করেন। একসময় তারা কুমিল্লাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন এবং নৃশংসভাবে নিহত হন।
এক হিসেবে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের বিভিন্ন সীমান্ত অঞ্চল থেকে প্রায় ৬০টি অনিয়মিত পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘দি পিপল’, ‘বঙ্গবাণী’, ‘রণাঙ্গন’, ‘বাংলার বাণী’, ‘বাঙলার মুখ’, ‘নয়া বাংলা’, ‘মুক্তিযুদ্ধ’, ‘বাংলাদেশ সংবাদ’, ‘প্রতিরোধ’, ‘সোনার বাংলা’, ‘দাবানল’, ‘সংগ্রামী বাংলা’, ‘স্বাধিকার’, ‘গ্রেনেড’, ‘বিপ্লবী বাংলাদেশ’, ‘জাগ্রত বাংলা’, ‘দুর্জয় বাংলা’, ‘বাংলাদেশ টুডে’, ‘অভিযান’, ‘দি নেশন’, ‘জনমত’, ‘উত্তাল পদ্মা’ উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও ছিল ‘সন্দ্বীপ থেকে ধলেশ্বরী’, ‘স্বাধীনতা’ এবং সেদিনের রংপুরের রৌমারী মুক্তাঞ্চল থেকে ‘অগ্রদূত’ যার সাথে আমার নিজেরও স¤পৃক্ততা ছিল।
এগুলো ছাড়াও লন্ডন থেকে বেরিয়েছে ‘বাংলাদেশ নিউজলেটার’, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ ওয়েস্ট কোস্ট নিউজ বুলেটিন’, বাংলাদেশ সমিতি, কানাডা থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ’ এবং বাংলাদেশ লীগ অব আমেরিকা, নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘শখা’।
সীমান্তবর্তী পত্রিকাগুলো স্বাভাবিকভাবেই অর্থ, কাগজ, ছাপাখানা এবং পরিস্থিতির চাপে নিয়মিত হতে পারে নি, সুদর্শনও হতে পারে নি। কিন্তু অপ্রতুলতা সত্ত্বেও এগুলো একদিকে যেমন শরণার্থীদের মনোবল চাঙা রেখেছে, অন্যদিকে সাহস জুগিয়েছে মুক্তিবাহিনীকে পাকিস্তানি হানাদারদের রুখতে।
আসামের করিমগঞ্জ ও গুয়াহাটি থেকেও একাধিক কাগজ বেরিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে। এদের মধ্যে ভূপেন্দ্র কুমার সিংহ স¤পাদিত ‘দৃষ্টিপাত’, হরেন্দ্র চন্দ্র সেন স¤পাদিত বাঙালি জাতীয়তাবাদী সাপ্তাহিক ‘প্রান্তীয় সমাচার’, খন্দকার আব্দুল মালেক সম্মাদিত ‘মুক্তি’ এবং ‘যুগশক্তি’। ‘জয় বাংলা’ নামে ত্রিপুরা এবং আসাম সীমান্তে আরও কয়েকটি পত্রিকা সেদিন বেরিয়েছে ব্যক্তিগত উদ্যোগে, যাদের একটির সম্পাদক ছিলেন প্রফুল্ল কুমার সরকার। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সীমান্ত অঞ্চল থেকেও একাধিক কাগজ বেরিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে। সবগুলোর খোঁজ আজ আমার কাছে নেই। তবে যে কাগজগুলোর কথা আমি উল্লেখ করেছি, তাদের অনেকগুলোর কপি আজও আমি রেখেছি। এ আমার নিতান্ত ব্যক্তি স্মৃতি সংরক্ষণের প্রয়াস, পেশাগত কোনো দায়িত্ব থেকে নয়। এসব কাগজের প্রতিটির পেছনে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের আবেগ, শ্রম আর দেশপ্রেম। একই সাথে ছিল সীমান্তের ওপারের বুদ্ধিজীবী শ্রেণির নিঃশর্ত সমর্থন, ছিল পাকিস্তানি হানাদারদের পরাজিত করে বাঙালির জাতীয় স্বাধীনতা অর্জনের অপ্রতিরোধ্য আবেগ। [সংকলিত]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী