,

Notice :
«» জেলা প্রশাসকের সাথে রিপোর্টার্স ইউনিটি নেতৃবৃন্দের সৌজন্য সাক্ষাৎ «» সরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবার মান আরো বৃদ্ধি করতে হবে : জেলা প্রশাসক «» জগন্নাথপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে ভুল রিপোর্ট প্রদানের অভিযোগ «» কালনী নদী থেকে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির লাশ উদ্ধার «» স্বেচ্ছাসেবক লীগের আনন্দ মিছিল «» সরকারি কলেজের ৭৫ বছর পূর্তি উদযাপনে জরুরি সভা আজ «» দুর্গাপূজা উপলক্ষে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে «» নতুন এমপিওভুক্তির আবেদন ৯৪৯৮, চলছে যাচাই-বাছাই «» দ্বিমুখী ক্ষতি থেকে অভিভাবকদের রক্ষা করুন «» টাঙ্গুয়ার হাওর : নৌ মালিক-চালকদের কাছে জিম্মি পর্যটকরা

মামলা সম্পদ মামলা বিপদ : অ্যাড. শহীদুজ্জামান চৌধুরী

মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে মামলা, বিরোধীদলীয় নির্বাচিত প্রতিনিধির বিরুদ্ধে মামলা, নতুন মামলা সৃজন করতে না পারলে পুরনো মামলায় জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধিদের কায়দা করে জড়িয়ে দেয়া, দুদককে কাজে লাগিয়ে কলাকৌশল করে মামলা, রাস্তায় গাড়ি পোড়ানোর সাথে নেতা-নেত্রীদের জড়িয়ে মামলা, সাবেক বহুল আলোচিত মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ভ্যানিটি ব্যাগ চুরির মামলা, বিশেষ ক্ষমতা আইনের অচল ১৬(২) ধারায় মামলা, আইনবিরুদ্ধ পন্থায় মানহানির মামলাসহ হাজার হাজার রঙ-বেরঙয়ের মামলায় সয়লাব হয়ে আছে দেশ। ভারী হয়ে গেছে দেশের কোর্ট আঙিনা। সময়ে এসব মামলা অনুকূল স¤পদ হিসেবে কাজে লাগলেও অসময়ে এ নেতিবাচক চর্চা ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে। ঘুরে দাঁড়াতে পারে মামলার প্রেক্ষাপট। যেমনটি দাঁড়িয়েছে সিলেটের রাগিব আলীর বেলায়। রাগিব আলী মামলাকে আয়ত্ত করেছিলেন নিজের মতো করে। নি¤œ আদালতের মামলাকে উচ্চ আদালত দিয়ে টুঁটি চেপে ধরা ছিল রাগিব আলীর কৌশল। সাধারণের মামলার নাগালের বাইরে থাকা ছিল তার লক্ষ্য। ২০১৩ সালে ৫০০ ধারার একটি মানহানির মামলায় সুনামগঞ্জ থেকে তার নামে সমন হয়েছিল। জামিনযোগ্য ওই মামলায় তিনি সুনামগঞ্জ আদালতে হাজির না হয়ে হাইকোর্টে হাজির হয়ে জামিন নেন। অতঃপর কলাকৌশল করে আপোসের পথে যেয়ে সুনামগঞ্জ না যেয়েই মামলা থেকে পরিত্রাণ লাভ করেন। ২০০৫ সালে হাইকোর্টে রিট করে জালজালিয়াতির দু’টি ফৌজদারি মামলার তদন্ত ঠেকিয়ে আঁতুড়ঘরে স্তব্ধ করে রেখেছিলেন। রিট মোকদ্দমার রুল চূড়ান্ত হওয়ায় মোকদ্দমাটি স¤পদে পরিণত হয়ে গিয়েছিল ২০০৬ সালে। সরকার আপিল করে ২০০৯ সালে। ২০১৬ সালে আপিল বিভাগের রায়ে রাগিব আলী হেরে যান। তার স¤পদের উৎস তারাপুর চা বাগান হাতছাড়া হয়ে যায়। স্থগিত থাকা জালজালিয়াতির দু’টি ফৌজদারি মামলা পুনর্জীবিত হয়ে ওঠে। পিবিআই তদন্ত করে চার্জশিট দাখিল করলে গ্রেফতারি পরোয়ানার খবরে পলায়ন, দেশ ত্যাগ, অবশেষে দেশে ফিরে হাজতে গমন এবং বিচার শেষে জেল কবুল। সবই ঘটে মামলার বদৌলতে।
মামলাকে স¤পদ মনে করে মামলার ওপর ভর করা, অপরকে মামলায় জড়িয়ে নিজের ক্ষমতার স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা ভাবনা আদৌ নিরাপদ নয়। নবম ও দশম সংসদ সরকারের আমলে অনিরাপদ মামলার চর্চাই বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। একই বিষয়ে দেশজুড়ে সিরিজ মামলার কা-কীর্তিও দেখেছে দেশবাসী। মানানসই হোক আর না হোক, মামলায় মামলায় জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করা হচ্ছে দেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের ও বিরোধী নেতাকর্মীদের।
অভিনবত্ব প্রদর্শিত হয়েছে ১৯৯৫ সালে দিনাজপুরের ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যাকে কেন্দ্র করে। মামলা করেন তৎকালীন দিনাজপুর বারের সভাপতি ৭০ সালের এমপি আব্দুর রহিম বাদি হয়ে। মামলায় দিনাজপুরের ডিসি-এসপি-কে আসামি করা হয়। একদিকে মামলা অন্যদিকে আন্দোলনের ঝড় বয় দেশব্যাপী। শুধু তাই নয় সরকারি কর্মকর্তাদের মাঠে ও মঞ্চে নামিয়ে এনে ‘জনতার মঞ্চ’ নাম দিয়ে আন্দোলন করে আওয়ামী লীগ। মানুষকে আন্দোলনমুখী করে তুলতে তারা সফল হওয়ায় ষষ্ঠ সংসদ টিকে থাকতে পারেনি। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাহীন করে অষ্টম সংসদ সরকার পূর্ববর্তী সপ্তম সংসদ সরকারের দুর্নীতিবাজদের তালিকা নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছিল। সপ্তম সংসদ সরকারের আমলেই দেশ প্রথমবারের মতো দুর্নীতিতে পৃথিবীর মধ্যে চ্যা¤িপয়ন হয়েছিল টিআইবি সূচকে। ক্ষমতাহীন আওয়ামী লীগ এ দুর্নাম নিয়ে বসে থাকেনি। তারা পঞ্চম সংসদীয় সরকার আমলের কুশীলবদের দুর্নীতিবাজ চিহ্নিত করে একটা পাল্টা শ্বেতপত্র প্রকাশ করে চুপসে দেয় ক্ষমতাওয়ালাদের। আওয়ামী লীগ প্রতিপক্ষের প্রতিটি আক্রমণাত্মক কর্মসূচির বিপরীতে বিপরীত কর্মসূচি দিয়ে নিজেদের শিরদাঁড়াকে শক্ত করে রেখেছে প্রতিনিয়ত। পাল্টা ক্ষেত্রে এমন চর্চা একেবারেই দেখা যায় না।
দ-বিধির ৫০০ ধারার মামলা নবম ও দশম সংসদ সরকার আমলে নবরূপ পেয়েছে। যে রূপের আকার নিকার আইনে পাওয়া যায় না। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৮ ধারায় কোনো পরিবর্তন না আসা সত্ত্বেও সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ছাড়া দেদারসে ৫০০ ধারার মানহানি মামলা করা হচ্ছে সব সম্ভবের এই দেশে।
আদালতগুলোও অপরাধ আমলে নিচ্ছে। ১৯৮ ধারায় বলা হয়েছে ‘চুক্তিভঙ্গ, মানহানি ও বিয়ে স¤পর্কিত অপরাধের অভিযোগ : সংশ্লিষ্ট অপরাধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির নালিশ ছাড়া কোনো আদালত দ-বিধির ১৯ বা ২১ অধ্যায়ের অধীন অথবা ৪৯৩ হতে ৪৯৬ (উভয় ধারাসহ ) অন্তর্ভুক্ত কোনো অপরাধ আমলে নিবেন না।’ মানহানির ৫০০ ধারা হচ্ছে দ-বিধির ২১ অধ্যায়ভুক্ত। মনে পড়ে, সাইফুর রহমান অর্থমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তার মানহানির জন্য ছেলে নাসের রহমান ঢাকার আদালতে ৫০০ ধারার মামলা করে শেষ পর্যন্ত আইনের কারণে এগোতে পারেননি। আইনের এই বাধ্যবাধকতা ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী একজন পাবলিক সার্ভেন্ট। পাবলিক সার্ভেন্টের বিরুদ্ধে কথা বলা, সমালোচনা করা নাগরিক অধিকার। মানহানিজনিত অপরাধের বিবরণের ৪৯৯ ধারার দ্বিতীয় ব্যতিক্রম এর আওতায় এ অধিকার সংরক্ষিত। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির নালিশ ছাড়া মানহানির অপরাধ আমলে নেয়া দস্তুরমতো ক্ষমতার অপব্যবহার। সময়ে এই অপরাধও কথা বলবে।
মামলাকে স¤পদ হিসেবে ব্যবহার করে ফায়দা ওঠানোর পথ ও পন্থা সব ব্যক্তি ও দলের সমানভাবে আয়ত্তে নেই। সাধারণের মধ্যে প্রচলিত একটি ধারণা রয়েছে মামলা হলেই পাল্টা মামলা দরকার। কাউন্টার ব্লাস্ট মামলায় অনেক শুভ ফল দেয়। গত ৯ বছরে দুর্নীতি পাহাড়সম হয়ে গেছে। ব্যাংক দুর্নীতির কাছেই হাওয়া ভবনের দুর্নীতি হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। ‘ক্ষমতায় না থাকলে টাকাপয়সা নিয়ে পালাতে হবে।’ শাসকদলের দুর্নীতির এমন সরস স্বীকৃতির পর যাদের সজাগ হওয়ার দরকার তাদের ঘুম ভাঙছে না। আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, বিএনপির সাধারণ স¤পাদক এমন কথা বললে পরদিনই জেলায় জেলায় দুর্নীতির মামলা করে তাকে সাক্ষী মানা হতো স্বীকারোক্তির জন্য। ভবিষ্যৎ ক্ষমতারোহণের স্বপ্নদ্রষ্টারা শাসকদলের এই ক্ষতগুলো আদৌ কাজে লাগাতে পারছেন না। স্বপ্নদ্রষ্টারা পদ বিতরণবাণিজ্য ও নমিনেশনবাণিজ্যের দুষ্টু বৃত্তের কবলমুক্ত হতে পারছেন না।
দুষ্টু বৃত্তের কবলমুক্ত হয়ে ক্রিমিনাল ল’ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট ১৯৫৮-এর ৪(১) ধারা, ও দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা ২০০৭ এর বিধি ১৩(৩) অনুসরণে দেশব্যাপী ছাড়িয়ে যাওয়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতগুলোয় নালিশী মামলা দায়েরের নিমিত্তে ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ মামলা মঞ্চ’ তৈরি করে শাসকদলীয় সুবিধাভোগী ও পাবলিক সার্ভেন্টদের মিলিয়ে আসামি করে প্রতি জেলায় অন্তত পাঁচটি করে, ঢাকায় অন্তত ৫০টি মামলার একটি স্কিম নেয়া হলে গতানুগতিক স্বার্থের ব্যতিক্রম স্বার্থযুক্ত একটি ইতিবাচক আন্দোলনের জোয়ার উঠতে পারে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী ও অর্থবহ জনমত গড়ে উঠতে পারে। বুদ্ধিবৃত্তিক এমন আন্দোলনের জোয়ারে মামলার হামলা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অস্থিরতা দেখা দিতে পারে ক্ষমতার তখত তাউসে। মনে রাখতে হবে সিনিয়র ¯েপশাল জজ আদালতে নালিশ দায়ের হলে সে নালিশ তদন্তের জন্য দুদকে যায়। এ নালিশের ওজন থাকে এজাহারসম। দুদক ইচ্ছা করলে তদন্তকালে আসামি ধরতে পারে। এমন সত্য মামলার জোয়ারে প্রতিহিংসাজনিত হয়রানিমূলক মামলার জনকদের নিশ্চিত বিপদ আসতে পারে। ফলে হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার শুরু হতে পারে। অন্যদিকে জেগে উঠতে পারে দুর্নীতিবিরোধী একটি স্বচ্ছ প্রতিবাদী জনশক্তি, যে শক্তির তোড়ে উবে যাবে অপশাসন ও দুর্নীতির হোলি খেলা। অবস্থাটা এমন হতে পারে মামলা এখন যাদের স¤পদ, তাদের হবে বিপদ আর মামলা এখন যাদের বিপদ তাদের হবে স¤পদ।
[লেখক : শহীদুজ্জামান চৌধুরী, আইনজীবী সিলেট বার, সাবেক সভাপতি সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি ও সাবেক সভাপতি সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাব]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী