,

Notice :
«» শাবিতে ভর্তি পরীক্ষায় ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে প্রথম হয়েছে শাহিলা চৌধুরী «» জগন্নাথপুরে প্রবাসীর উদ্যোগে রাস্তায় মাটি ভরাট «» স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রয়াত সভাপতি রমা দাসের জন্মদিন পালন «» সামাজিক সম্প্রীতি বিষয়ক কর্মশালা «» হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের বাদাঘাট দক্ষিণ ইউনিয়ন কমিটি গঠন «» ধর্মপাশায় পূজা মণ্ডপ পরিদর্শন করেন রনজিত সরকার «» কাজ-না-করা সরকারি প্রতিষ্ঠান দেশের উন্নতিকে পিছনে টানে «» পণ্য প্রদর্শনী মেলায় নিম্নমানের পণ্যের দাম অধিক «» তাহিরপুর-মধ্যনগরে ব্যারিস্টার ইমনের মতবিনিময়: নির্বাচনী এলাকায় নতুন আলোচনা «» শিক্ষক সংকটে দক্ষিণ সুনাগঞ্জের অধিকাংশ বিদ্যালয় ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম

একজন রমা কিংবা আমাদের গন্তব্যে ফেরা : রণদীপম বসু

১.
স্বাধীনতা-উত্তর যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ। নিস্তরঙ্গ সুনামগঞ্জ তখন একান্তই ছোট্ট একটা মহকুমা শহর হলেও মুক্তিযুদ্ধকালীন শহর ছেড়ে ভারতের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে শরণার্থী হওয়া পরিবারগুলো অনেক ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে ফিরতে শুরু করেছে। সেই দলে আমাদের পরিবারও ছিল। তার কিছুদিন পর ঊনিশ শ’ বাহাত্তর সালে অটোপ্রমোশন পেয়ে ক্লাস ফোরে উঠে গেছি আমি। বাসা থেকে কালিবাড়ি প্রাইমারি স্কুল, আসা-যাওয়ার রাস্তা আর তার দু’পাশের পরিপার্শ্বিকতাই তখন আমার শৈশবোত্তীর্ণ কৈশোরের উন্মেষকালে বেড়ে ওঠার নিজস্ব গ-ি। বাসার ঠিক সামনেই প্রধান সড়কটার অপরপার্শ্বে কচুরিপানায় ভর্তি বিরাট পুকুরটার, যেটি ভরাট হয়ে এখন পৌর বিপণিবিতানে রূপ নিয়েছে, তার পাড়ঘেঁষে আমার বিপন্ন কৈশোরের প্রথম বিস্ময় নিয়ে গড়ে উঠলো শহীদ মিনারটা। জীবন-প্রভাতে এ এক নতুন অভিজ্ঞতা বৈকি। মিনারের বেদীর পেছনের দেয়ালস্তম্ভটার পুরো গা-জুড়ে লাল-সবুজে মাখানো বিশাল পতাকার রঙ। ওটার দিকে একদৃষ্টে তাকাতে পারতাম না কখনোই। মাতৃহারা বুকটা খাঁ খাঁ করে ওঠতো, চোখ ভিজে যেতো নিমেষে। ওই উজ্জ্বল রঙের সাথে আমার মায়ের চেহারাটা কেন যেন একাকার হয়ে মিশে যেতো। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনভাই, একবোন আর মা সহ পাঁচ পাঁচজন সদস্য হারিয়ে টিকে থাকা পিতা-পুত্রের চারজনের নারীবিহীন পরিবারটা যে কতোটা বিপর্যস্ত ছিল সেটা বুঝে ওঠা বা বর্ণনা করার প্রয়োজনীয় বোধবুদ্ধি গড়ে ওঠেনি হয়তো। বালক বয়সের এক দুর্বোধ্য শূন্যতার মধ্যে যন্ত্রচালিতের মতো কখন কী করতাম জানি না। জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে বোধকরি খুব একটা ফারাক ছিল না তখন আমার।
সাধনা ঔষধালয়ের সামনে ডান কোণায় রাস্তার পাশের বেশ বড়সড় কদম গাছটা তখনো আমাদের বাসাটাকে ছায়া দিয়ে রাখতো। তার থেকে পনের-বিশ হাত দূরত্বে মন আকুল করা কৃষ্ণচূড়া গাছটা ছাড়িয়ে আরো পঁচিশ-ত্রিশ হাত তফাতে যে আরেকটা বেশ বড় বাঁকানো কদমগাছ ছিল, ওটার সাথে আমাদের কৈশোর জড়িয়ে ছিল বিভিন্নভাবে। তখনকার শ্যামল-সুন্দর সুনামগঞ্জ শহরটাই তো ছিল অসংখ্য পুকুর ডোবা খাল আর গাছপালার সমাহার। ফলে শহরের রাস্তার পাশের দোকানঘরগুলোর মেঝে বলতে কাঠের বা বাঁশের মাচার তৈরি পাটাতন বিশেষকেই বোঝাতো। সেই কদমগাছটার নিচেও একটা পুকুরসদৃশ মজা ডোবা ছিল। গাছটাকে প্রকৃতি এমনভাবেই গড়ে দিয়েছিল যে একটা বাঁদর বাহিনী সামান্য কসরতেই যেন হাতের ব্যবহার প্রায় না-করেই মগডাল পর্যন্ত উঠে একটা নিরাপদ আস্তানা বানাতে পারে। বামা ফার্মেসির রমা, পাবলিক লাইব্রেরির শংকর, দেশবন্ধুর দীপক, মিহির, জেলরোডের সাজুসহ আরো অনেকেই কখন কিভাবে যেন সেই বানরবাহিনীর সদস্য হয়ে ওঠেছিলাম। গিলমানও ছিল। ওদের বাসা ছিল পোস্টাফিসের পাশে। আমাদের প্রধান লক্ষ্যই ছিল যে-যার স্কুল থেকে ফিরে কার আগে কে গিয়ে মগডালের সবচাইতে আরামপ্রদ ডালের সিংহাসনটা সেদিনের মতো নিজের দখলে নিয়ে নেয়া। তবে খুব সতর্ক থাকতে হতো একটি বিষয়ে। গাছটার পাশেই একটা টঙসদৃশ হোমিও ফার্মেসি ছিল। দোকানের গম্ভীর হয়ে থাকা ডাক্তার বাবুকে আমরা তরণী কাকু বলে ডাকতাম। ভীষণ বেরসিকগোছের। তখন কি আর বুঝতাম যে তিনি ছিলেন সুনামগঞ্জ নাট্য আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তি সর্বজন শ্রদ্ধেয় ডাক্তার তরণী কান্ত দে!
শহরের যুদ্ধবিধ্বস্ত বাড়িঘরগুলো তখনও নতুন করে ঠিকঠাক করা হয়ে উঠেনি। ইতোমধ্যেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে হঠাৎ করে শুরু হল নিয়মিত গুঁড়ো দুধ আর পুষ্টিমানসমৃদ্ধ বিস্কুট বিতরণ। এ আরেক নতুন জিনিস। দু’ধরনের পাউডার বিতরণ হতো তখন। আমাদের কাছে এ দুটোর নাম ছিল বিলাতি দুধ আর ছাতুর গুঁড়া। পুষ্টিমানের মর্ম কি আর বুঝি! তবে দুটোই খুব সুস্বাদু ছিল। বিকেলে স্কুল থেকে বাসায় ফিরেই একটা কাগজে কিছু দুধ বা ছাতুর গুঁড়া নিয়েই দৌড় লাগাতাম কদম গাছটার দিকে। এক লাফে কা-ের বাঁকানো অংশে এক পা দিয়ে অন্য পায়ের কসরতে তারপর তরতর করে উঠে যেতাম এডাল-ওডাল করে মগডালে। কখনো দেখা যেতো আগেভাগেই আরেকজন চড়ে বসে আছে, কখনো নিজেরই প্রথম হাজিরা। এ প্রক্রিয়ায়ই একদিন আগেভাগে চলে এসেছি আমি। নিরিবিলি শহরের গড়ানো দুপুরে রাস্তায় লোকজনের আনাগোনাও নেই তেমন। সেদিন যে আগেভাগে একটু বৃষ্টি হয়ে গেছে তার তোয়াক্কা না-করেই যথানিয়মে মগডালের কাছাকাছি পৌঁছেও গেছি প্রায়। হঠাৎ কী যে হয়ে গেল! ফসকে গেলাম! ভয়ংকর কিছু যে ঘটে গেছে তা বোঝার আগেই এক তীব্রতম ঝাঁকুনির সাথেই মজা ডোবাটার পাড়ে পড়ে থাকা পাথরটার পাশেই হাত খানেক কাদার মধ্যে নিজেকে বসা অবস্থায় আবিষ্কার করলাম কেবল। কিন্তু শরীরের ভেতরের সবকিছু মনে হয় চুরমার হয়ে গেছে। দম আটকে গেছে অনড় পাথরের মতো। সব অন্ধকার হয়ে আসছে। বুক ভরে একটিবার দম নেয়ার জন্য মুখটাকে সমস্ত শক্তি দিয়ে হা করে ভীষণ ছটফট করছি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। দম ফুরিয়ে গেল। বুঝলাম একেই বুঝি মৃত্যু বলে! নেতিয়ে পড়তে পড়তে শেষপর্যন্ত কিভাবে একটু বাতাস বুঝি ঢুকে গেছে ফুসফুসে। ঝাপসা চোখে শেষবারের মতো তাকিয়ে একটা ছায়ামতো কাউকে যেন দেখলাম! শঙ্কর? নাকি রমা? নাকি সাজু? চিৎকার করে কিছু বলতেও চাইলাম। কোন শব্দ নয়, গলা দিয়ে শোঁ শোঁ করে কিছু বাতাস বেরোল মাত্র। তারপর আর কিছু জানি না।
গোঁ গোঁ শব্দ করে কিছুটা চৈতন্য ফিরে পেলাম যখন, দেখি বুক সমান পানিতে কারা যেন আমাকে বসিয়ে শরীর ঝাঁকাচ্ছে। বিকাশের বাবা সম্ভবত। মরিনি তাহলে! পুকুরের সেই পরিচিত ঘাটলা, যেখানে এখন পৌর মার্কেট। তারপর কেউ আঁড়কোলা করে আমাকে তুলে নিলো যেন। আবারো অন্ধকার সব। একটা কোলাহল টের পেলাম, ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং চোখ খুললাম। শক্ত কিছুতে শুয়ে আছি। সুনামগঞ্জ হাসপাতালের মেঝে ওটা। বেড খালি নেই। আমাদের বাসার সাথে হাসপাতালের দূরত্ব পুকুরটার এপাড়-ওপাড় কেবল, যদিও আসতে হয় থানার সামনে দিয়ে বাজারের রাস্তা হয়ে জেলখানার দেয়ালের পাশে দিয়ে আবার বায়ে ঘুরে। ধাতস্থ হতেই এক্সিডেন্টের কথা মনে পড়লো। দরজার দিকে তাকাতেই রমার মুখ। না কি অন্য কেউ? কী করুণ চোখে চেয়ে আছে সে আমার দিকে। উঠে বসতে গিয়ে টের পেলাম শরীরটা একটা লাঠির মতো শক্ত জড় হয়ে গেছে। কিছুতেই বাঁকানোর জো নেই। গোটা শরীরে ব্যথা। উঠার চেষ্টা করতেই কিনা মেরুদ-েও ব্যথা শুরু হয়ে গেল। কেঁদে ওঠেছি হয়তো। আবারও দরজার দিকে তাকিয়ে দেখি রমা নেই। আমাদের মধ্যকার সবচাইতে নিরীহ সাথীটি। একে অন্যের সাথে মারামারি গালাগালি কতো কী করেছি, সবচেয়ে বেশি করেছি শংকরের সাথে। কিন্তু রমার সাথে এরকমটা কারোরই হয়েছে বলে মনে হয় না। কিলাকিলির পর্যায়ে আসার আগেই এক ধরনের নীরব অভিমান নিয়ে বুঝি মাথা নিচু করে চলে যেতো সে। কয়েকদিন আসতোই না। তারপর আবার এসে হাজির, যেন কিছুই হয়নি। তখন না বুঝলেও এখন বুঝতে পারি, কৈশোর মানেই এক অবোধ্য রহস্যময়তা। ডিউটি ডাক্তার এসেই হাত বাড়িয়ে আমার হাতটি ধরে টান দিলেন। প্রাণখোলা হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন- কী খবর এখন? উঠো উঠো। কিন্তু আমি যে একটা লাঠির মতো হয়ে গেছি! সব ঠিক হয়ে যাবে। এই আশ্বাস ঢেলে দিয়ে চলে গেলেন।
তিনদিন পর সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে রিলিজ হবো। কী আনন্দ আমার সাথীদের মুখে! কিন্তু আমাদের জন্যে দুঃসংবাদটাও জানা হয়ে গেল, এখন থেকে আমাদের প্রিয় কাজ গাছে চড়া নিষিদ্ধ। ছোট্ট শহরে তখন সবাই সবাইকে চিনতো, একটা গ্রামই যেন। কিছু ঘটলেই সে খবর চলে যেতো সবকটি পরিবারেই। তবু গাছটার প্রতি আমাদের আকর্ষণ কমেনি একটুও। বেশ ক’বছর পর সরকারি লোকেরা গাছটিকে গোড়া থেকে ইয়া বড়ো করাত দিয়ে কাটা শুরু করলে কী এক অবোধ্য ব্যথায় মনে হয়েছিল তারা যেন নির্দয়ভাবে আমাদের কৈশোরটাকেই কেটে ফেলছে। মানুষ এতো নিষ্ঠুর হয় কেন!
এই শহরের ল্যান্ডমার্ক হয়ে এককালে বর্তমান আলফাত স্কয়ার (ট্রাফিক পয়েন্ট)-এর পাশেই শাহানশা’র মতো অসম্ভব উঁচু আর প্রকা- একজোড়া মহাবৃক্ষ ছিল। কী জাতের গাছ ছিল তার নাম জানি না। যেন এ শহরেরই স¤্রাট-স¤্রাজ্ঞী এরা। বহু দূর থেকেও নজরে আসতো। তার আবছা শীর্ষে মাঝেমধ্যে ধনেশ পাখিও নাকি বসতো এসে। এরকম অপরিচিত পাখি আমরাও দেখেছি। আমার এই ভবঘুরে জীবনে এতো উঁচু আর প্রকা- গাছ আজতক কোথাও দেখিনি আর। গাছগুলোর বেড় দেখে চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যেতো। শহরের উপর দিয়ে একরাতের বয়ে যাওয়া এক মহাপ্রলয়ংকরী ঝড়ে তার একটা কিভাবে যেন উপড়ে গেল, সে কি ভয়ংকর অবস্থা! যুগল ভেঙে শায়িত এ বৃক্ষরাজের তলায় চাপা পড়ে কতো দোকান-পাট যে চিড়েচ্যাপ্টা হয়েছিল। চাপা পড়া সেই মেডিক্যাল হল বা ফার্মেসির কথা মনে আছে, যেখানে সুনামগঞ্জের তখনকার ডাকসাইটে ডাক্তার ধীরেন্দ্র দেব সেখানে প্র্যাকটিস করতেন। ডাক্তাররা যে একইসাথে ভারিক্কি ও রসিকও হন, তাঁকে দেখেই প্রথম বুঝেছি। তিনি আমাদের পারিবারিক ডাক্তারও ছিলেন। যখন তখন তার কাছে আমাকেই যেতে হতো বাসায় আনতে। ফার্মেসিটার মালিক ছিলেন অঞ্জনের বাবা খোকন চৌধুরী। তিনি জমিদার বংশের সন্তান ছিলেন। বিরাট চৌহদ্দি নিয়ে বাসার সামনের দিকেই ফার্মেসিটা ছিল। সরকারি ব্যবস্থাপনায় ভূপাতিত গাছটাকে টুকরো টুকরো করে কেটে সরিয়ে নিতে অনেকগুলো দিন লেগেছিল। তারপর যুগলের অন্য নিঃসঙ্গ গাছটাকেও হয়তোবা নিরাপত্তার কারণে বহুদিন লাগিয়ে একটু একটু করে কেটে কেটে নিঃশেষ করে দেয়া হয়েছিল। এরপর থেকে এই শহরটাই বুঝি কেমন আব্রুহীন হয়ে গেল, হয়তো আমাদের ভবিতব্যের মতোই।
বর্তমান আলফাত স্কয়ারের (ট্রাফিক পয়েন্ট) কোণাটায় ছিল পুরনো ভাঙাচোরা টিনের একটি বিশাল পরিত্যক্ত দোতলা হলঘর। সবাই পুরান কলেজ নামে ডাকতো। ভেতরে অন্ধকার ঝোপঝাড়ে পরিপূর্ণ ছিল, ভয়ে ভেতরে ঢুকতাম না কখনো। তার সামনের রাস্তা ঘেঁষে খোলা জায়গাটাতে মাঝে মাঝে রাজনৈতিক জনসভা হতো। সেদিন আশপাশের রাস্তাগুলো উন্মুখ শ্রোতায় ভরে ওঠতো। অন্য সময়ে জায়গাটা বিভিন্ন ধরনের ঔষধ তাবিজ মলম ইত্যাদির ক্যানভাসারদের দখলেই থাকতো। অথচ এটাই ছিল শহরের হার্টপয়েন্ট যাকে বলে। আমাদের আকর্ষণ ছিল বেদেদের আনা নিয়মিত সাপের খেলা দেখা। একধরনের লতা বা শিকড় বেচতো তাঁরা। বড়সড় কাঠের বাক্সগুলোর ডালা খুলে তা থেকে বের করা হতো ছোটবড়ো হরেক রকমের সাপ। কী সব নাম তাদের! ছোট্ট সূতার নাল থেকে বিশাল সাইজের অজগরও দেখেছি বহুবার। আকর্ষণীয় শারীরিক কসরতের সাথে ক্যানভেসারদের মজার মজার গল্প শুনতাম আর হেসে কুটিকুটি হতাম আমরা। অপেক্ষায় থাকতাম কখন বলে ওঠবে ‘বাচিয়া লোক তালিয়া বাজাও’, আর আমরা একজোটে তালি বাজাতে বাজাতে হৈ হৈ করে ওঠতাম।
আমাদের সাইকেল চালানো শেখাও শুরু হল দল বেঁধে। রয়েল না কী যেন নামের একটা সাইকেল ছিল আমাদের, গিলমানদের ছিল রেলি সাইকেল। খুব সম্ভবত রমাদেরও একটা ছিল। সবই বড়দের সাইকেল। আমাদের দ্রুত বড় হতে না পারার দুঃখের মতো শরীরের উচ্চতা তো আর বাড়ে না সহজে। ডান হাতের বগল দিয়ে সাইকেলের সিটের উপর শরীরের সকল ভার অর্পণ করে রডটাকে শক্ত করে ধরে বাঁ হাতে স্টিয়ারিং-এর দায়িত্ব নিয়ে সাইকেলের ফ্রেমের মধ্য দিয়ে পা গলিয়ে ত্রিবক্র হয়ে ছোট ছোট প্যাডেল মেরে কী আপ্রাণ প্রচেষ্টা আমাদের। একবার এদিকে পড়ি তো আরেকবার ওদিকে পড়ি সাইকেলসহ। কোনোভাবে দু’হাত যেতে পারলেই এই বুঝি পাক্কা চালক হয়ে গেছি! ঝিমডাকা কটকটে গ্রীষ্মের দুপুর গড়িয়ে যার যার অভিভাবকরা যখন দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রায় শায়িত, আমরা তখন ভান ধরে থাকা ঘুম থেকে উঠে চুপি চুপি যার যার সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম নিঃশব্দে। এসময়ে শহরের রাস্তা পুরো ফাঁকাই থাকতো। জীবনের ব্যস্ততা সেকালের মানুষকে এতোটা গ্রাস করেনি তখনও। দুপুর রোদের তাপ কিভাবে কখন গলে পড়তো সাইকেল আর শহরের গনগনে পিচের রাস্তায়, সে খেয়াল কে করে। কোনভাবে প্যাডেল মেরে কিছুক্ষণ ব্যালেন্সে থাকতে পারলেই শিখে ফেলার কী আনন্দ। তারপর ডাবলিং, ট্রিপলিং করার প্রয়াস। সাইকেল নিয়ে কখনো রাস্তা ছেড়ে খালে পড়া, কখনো সঙ্গীসহ রাস্তার মধ্যে আছড়ে পড়া, কখনো রিকশা বা পথচারীর গায়ের উপর তুলে দেয়া, শরীরের বিভিন্ন অংশ ছিড়ে রক্তাক্ত হওয়া এসবকিছুই যে আমাদের অভিযানের কাছে নস্যি। কে কতো দক্ষ কিংবা কার সাইকেল অতিউত্তম তার প্রতিযোগিতাও কি আর বাদ থাকে?
একদিন গিলমান বললো সাইকেলের জগতে ওর রেলি সাইকেলটাই সেরা। কিন্তু আমার ব্রিটিশ রয়েল সাইকেল কি তাহলে ফেলনা! রমা আর শংকরের মধ্যস্থতায় শুরু হল প্রতিযোগিতা। পুরান কোর্টের সামনে থেকে শুরু হল দুই ত্রিবক্রের প্রতিযোগিতা। কিন্তু কোত্থেকে কোথায় যেতে হবে তা তো নির্ধারণ করা হয়নি! যার যেটুকু সাধ্য আর সামর্থ তা দিয়েই ছুটছি। পেছনে দৌড়াচ্ছে ওরা। শুরুতেই গিলমান এগিয়ে গেছে। জুবিলী স্কুলের পরই উকিলপাড়ার মোড়ে গিয়ে সে হঠাৎ হাসননগরের দিকে ডানে মোড় নিয়ে নিল। কিন্তু আমি তো এরকম প্রস্তুত ছিলাম না। সোজা লক্ষ্যেই চালাচ্ছিলাম। গেলমানকে মোড় ঘুরতে দেখে আমিও দিক পাল্টাতে গেলাম। কিন্তু নবিশকালীন আমার তো তখনও এই জ্ঞান হয়নি যে তীব্র গতি নিয়ে মোড় ঘোরা যায় না কখনো! দুই রাস্তার মাঝের কোণাটায় একটা ডোবার উপর তখনকার প্রচলিত নিয়মে বাঁশের মাচার উপর বাঁশের বেড়া দেয়া একটা মিষ্টির দোকান ছিল। সামনের দিকে গ্লাস লাগানো বড় আলমারি বা রেকটাতে কতো পদের মিষ্টির বড় বড় গামলা। আমার তীব্র গতির সাইকেল আচমকা ডানে ঘুরতে চাইলে কী হবে, পদার্থবিদ্যার নিয়ম মেনে সাইকেলসহ দোকানের বেড়া ভেঙে ভীষণভাবে আছড়ে পড়লাম সেই মিষ্টি আলমারির উপর। বলার অপেক্ষা রাখে না, গেলো রে… গেলো রে… আর ঘটনার আকস্মিকতায় উল্টে পড়া দোকানের আলমারি-চেয়ার-টেবিল গ্লাস আর মিষ্টিতে রসে একাকার হয়ে আমি তখন ছাঁটে আটকানো ইঁদুরের মতো ছটফট করছি। বর্তমান যুগ হলে কী হতো জানি না, কিন্তু দোকানের ও আশেপাশের লোকজন এসে আগে আমাকে উদ্ধারে ব্যস্ত। ছাড়া পেয়ে আমি তো পড়ি কি মরি হয়ে ছুট, আহত কি রক্তাক্ত সেদিকে কে তাকায়! কিন্তু তখন কি আর বুঝতাম, এই ছোট্ট শহরের অধিবাসীরা প্রাপ্তবয়স্ক সবাই সবাইকে নাড়ি-নক্ষত্রসহ একনামে চিনে! রমা আর শংকর তখন কোথায় ছিল জানি না, তবে দিন শেষে বাসায় অভিযোগ চলে গেল ঠিকই। যেটুকু ক্ষতি করেছি তা পূরণের নিমিত্ত যে শেষতক এই নধর দেহের উপর দিয়েই যাবে তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে! এরকম কতো পুরনো দাগ এখনো শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছি। যেন কৈশোর লেপ্টে আছে শরীরে সেই সাথীরাসহ।
আমরা তখন আরেকটু বড় হয়ে যাচ্ছি। বিশাল পুকুরটা ভরাট হতে লাগলো বালু আর বালু দিয়ে। অর্ধভরাট হতেই আমাদের কী আনন্দ! আমরা বলতাম বালুর মাঠ। এবার মনমতো খেলার জায়গা হয়েছে। আর মারবেল বা ডাঙগুলি বা সিক দিয়ে সিগারেটের পরিত্যক্ত প্যাকেট বাজি রেখে খেলতে হবে না। এখন আমরা বড়দের মতো ফুটবলও খেলতে পারবো। বালিতে লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপিসহ কাগজ দলা করে সুতলি দিয়ে বেঁধে বল বানিয়ে শুরু হল প্রাথমিক পর্ব। তারপর আরেকটু বড় হলে কিভাবে যেন একটা চামড়ার বলও জোগাড় হয়ে গেল। এর কৃতিত্বটা সম্ভবত দেশবন্ধুর দীপকের। তখনকার বিখ্যাত দেশবন্ধু মিষ্টান্ন ভা-ারকে শহরের সবাই ‘বলার দোকান’ বলেই ডাকতো। দীপকের বাবার নামের বলরাম থেকে অপভ্রংশ হয়ে এরূপ হয়েছে পরে বুঝেছি। প্রায় প্রতিদিনই চামড়ার খোলস থেকে ব্লাডারটাকে আলগা করে সাইকেল পাম্পার দিয়ে বাতাসে পরিপূর্ণ ফুলিয়ে আবার বিশেষ কায়দায় বেঁধে খেলার উপযোগী করা হতো বলটাকে। এসবে কি আগ্রহ একেকজনের! আমাদের নিয়মিত খেলোয়াড় নিরিবিলি রমা, মেজাজি শংকর, একগুঁয়ে বিকাশ (যদিও সে আমার ছোট ভাই শীলুর সহপাঠী ছিল), লাল্টুপুল্টু গিলমান, ভীমাকৃতির রসিক দীপক, তার ছোট ভাই নধরকান্ত মিহির, স্টেডিয়ামের পাশের পল্লী থেকে নিয়ম করে হাজির হওয়া মঙ্গল এবং তাৎক্ষণিক জুটে যাওয়া আরো অনেকেই। খেলা তো নয়, খেলা নিয়ে নিয়মিত মন কষাকষি, ঝগড়া আর মারামারির এক আড়ম্বর আয়োজন। কিন্তু পরদিন আবার যে-কে-সেই। আমরা কেউ খেলোয়াড় হতে পারিনি এক মঙ্গল ছাড়া। যে কি-না পরবর্তীকালে বিখ্যাত গোলকিপার হিসেবে নাম কুড়িয়েছে। সবচাইতে মজার বিষয় হল, কৈশোরের খেলার সাথি আমরা কেউ কিন্তু একই স্কুলের সহপাঠী ছিলাম না। কিন্তু দুপুর গড়ালেই আমাদের একটাই ঠিকানা হয়ে যেতো। ওই গ্রুপে লেখাপড়া নিয়ে কখনোই কোন আলাপ হতো না। হবে কী করে! নিয়ম করে সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফিরে পড়তে বসার মতো জঘন্য কাজটাতে যে আমরা সবাই খুবই ত্যক্ত-বিরক্ত ছিলাম। পুকুরটা পুরোপুরি ভরাট হয়ে গেলে ক্যানভেসাররা এই ‘বালুর মাঠ’টাকেই বেছে নিল। কোন আয়োজন বা জনসভার উপযুক্ত স্থানও হল এটা। বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, কর্নেল ওসমানি, মেজর ইকবালসহ আরো কতো কতো নেতাদের জনসভা দেখেছি এখানেই।
কিশোর মনে আমাদের বড় হবার ইচ্ছেটা আমাদের কাছে বড় বেশি ধীরগতির মনে হলেও সময়ের গতিতে আমরা তো একটু একটু বেড়ে উঠছিলাম ঠিকই। শহরটাও একটু একটু করে নিজেকে বদলে নিচ্ছিলো জীবনের নিয়মে। আর একইভাবে নিজেদের এই গ্রুপের বাইরেও আমাদের যার যার নিজস্ব বলয়ে আরো কিছু থোকা থোকা বন্ধু গ্রুপ তৈরি হতে লাগলো। পরবে-পার্বণে ঘটন-অঘটনের মধ্য দিয়ে আমরাও ক্রমান্বয়ে আরও বিস্তৃত হতে লাগলাম। এবং একদিন বাসা বদলের মধ্য দিয়ে অনেকটা দূরবাসী হয়ে নিত্যদিনের মিলনমেলা থেকে আমিই ছিটকে গেলাম প্রথম, আমার নিজস্ব ডাকনামটি নিয়ে, যে নামটি আমার পরিবার প্রতিবেশী ছাড়া আর কেবল আমার কৈশোরের বন্ধুরাই চিনে। তারপর একদিন স্কুলের গ-ি পেরিয়ে শহর থেকে সেই যে বাইরে ছিটকে পড়লাম, নিজের নাড়ির বৃত্তে আর ফেরা হলো না সেভাবে। কতো স্মৃতি, কতো মায়া, কতো কষ্ট বুকে বয়ে আর ভাবারই ফুরসত পেলাম না যে, বিপন্ন শৈশব-কৈশোরের এক পর্যুদস্ত সময়ে যে সাথীরা আমাকে জাগিয়ে রেখেছিল জীবনের দিকে সঙ্গ দিয়ে মায়া দিয়ে, তারা আজ কে কোথায় কিভাবে আছে! আর তারাই কি জানে, এক পোশাকি নামের বর্মে নিজেকে আড়াল করে আমিইবা কি রকমভাবে বেঁচে আছি!

২.
বাংলায় ‘থমকে যাওয়া’ বলে একটা কথা রয়েছে। এর মর্মার্থ আমরা সবাই জানি। চলমান কোন কিছু আকস্মিক থেমে যাওয়া। কিন্তু এই বস্তুজগতে এমন ঘটনা তো আকছার ঘটছেই। তাহলে থমকে যাওয়াটা এতো আশ্চর্যের হয় কেন? মানুষের মনোজাগতিক ভাবার্থটা মনে হয় এরকম যে, এমন কোন অভাবনীয় ঘটনা যা কখনও বা ওই সময়ে ঘটার কথা ছিল না অথচ প্রত্যক্ষ সাক্ষী করে ওই ব্যক্তির সামনে অকস্মাৎ ঘটে গেছে এমন কিছু। যেজন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। হয়তো এরকম আরও কোন অর্থবাদ থাকতে পারে। তবে বিবিধ অর্থে কথাটাকে প্রয়োগ করা হলেও বস্তুত ‘থমকে যাওয়া’র একটাই মর্মার্থ, সময় থেমে যাওয়া। জগতে মানুষের বোধগম্য পর্যায়ে এরকম অভাবনীয় ঘটনা তো কেবল একটাই হতে পারে, তা হলো সময় থমকে যাওয়া। প্রবহমান জীবন আচমকা থেমে যাওয়া। কিন্তু সময় কি থামে কখনও! খ-িত কালকে ধারণ করে একক ব্যক্তি থেমে যায় হয়তো, কিন্তু চিরায়ত পরম্পরা নিয়ে মানুষ তো চলতেই থাকে। এই চলমানতাই জীবন। মহাকালের ডায়েরিতে থামা বলে কিছু কি আছে? তাহলে আমরা থমকে যাই কেন?
থমকে যাওয়াটা আসলে জীবিতের উপলব্ধি। ঘটনার আকস্মিকতায় জীবিত মানুষই থমকায়। সময় থমকায় না। সময়ের সচেতনতা হারিয়ে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যক্তিমানুষ যখনই সময়ের স্বাভাবিক গতিপথ ছেড়ে আচমকা পেছনে আছড়ে পড়ে, ঝাঁকুনির তীব্রতায় বেসামাল হয়ে পড়ে সে। কোনো দিকেই যাওয়া হয় না তার। ওটাই থমকে যাওয়া। কেননা, সময়ের পেছনে কি আদৌ যাওয়া সম্ভব! কম-বেশি সবার জীবনেই হয়তো তা ঘটে থাকে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন মাত্রায়। বাস্তব জগত থেকে এমন আকস্মিক স্মৃতির কুয়াশাময় এক হারানো জগতে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে আর কীভাবেই বা ব্যাখ্যা করা চলে?
অফিসের কাজের ফাঁকে অ্যানড্রয়েড মোবাইলে অনলাইন নাড়াচাড়ার মধ্যে অনুজপ্রতিম কল্লোল তালুকদারের একটা সচিত্র ফেসবুক পোস্টে চোখ আটকে গেল সেদিন। জীবনের অনেক বেখাপ্পা ঘটনাবলির মতোই খাপছাড়া ক্যাপশনের সাথে ছোট্ট মেয়েটিকে মাঝে রেখে কোন অফিসে অবস্থানরত এক প্রায়-মধ্যবয়েসী সুখময় দম্পতির ছবিকে মেলানো যাচ্ছে না কিছুতেই! বক্তব্যের সারমর্ম, রমা দাস আর নেই! ধক্ করে ওঠলো বুকটা! এক সুদীর্ঘ অনুপস্থিতির মধ্যে হঠাৎ ‘রমা’ নামটার অভিঘাত ততক্ষণে কোন্ সুদূরের কোথায় গিয়ে যেন আছড়ে-পাছড়ে ওলট-পালট করে দিলো কিছু! মহাকালের গর্ভে জগতের অসংখ্য সত্তাময়তায় ‘আছে’র বিপরীতে অনিবার্য ‘নেই’ হওয়ার অবশ্যম্ভাবিতাকে এড়াতে পারেনি কেউ, পারবেও না জানি। কিন্তু বিদগ্ধ পাঠক ও নিতান্ত অলস লেখক হিসেবে যে কল্লোলকে আমি চিনি তাঁর বক্তব্যের অস্বাভাবিকতায় আক্রান্ত হয়ে অন্তত পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ বছরের পেছনবাধা ঠেলে অমিল খোঁজার এক গোপন ইচ্ছায় ছবিটা জুম করে ভালো করে নিরীক্ষণ করতে লাগলাম। সুনামগঞ্জের ছেলে কল্লোলের সাথে পরিচয় খুব বেশি দিনের নয়, কিন্তু আমার শৈশব পার হওয়া কৈশোরের দুরন্তপনার অন্যতম সাথী রমাও তো সুনামগঞ্জ শহরেরই আজন্ম ধূলোবালি মাখা সবুজ সন্তান। বিশাল দীর্ঘবিচ্ছেদের অন্তরালে তাও আর জানার সুযোগ হয়নি যে সাম্প্রতিক সে সুনামগঞ্জ স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ছিল। কল্লোলের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকেই প্রথম জানলাম আমি। কিন্তু সেই সুদূরের স্মৃতিময় কিশোর মুখটার সাথে ছবিটার যতোই অমিল খোঁজার প্রয়াস করছি ততই কী আশ্চর্য নিষ্ঠুরভাবে প্রায় মধ্যবয়সী ছবিটা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে! আমার চশমার পাওয়ারেই কোন সমস্যা হবে হয়তো! রমা দাস কি জগতে একজনই! আশঙ্কা অসত্য করার শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে এবার কল্লোলের পোস্টে ইনয়বিনয় করে মন্তব্য লিখলাম- সুনামগঞ্জ পুরাতন হাসপাতালের গেটের সামনে বাজারের মধ্যে যে ফার্মেসিটা আছে রমা কি সেখানকার কেউ! কিন্তু মানুষ এমন নির্দয় হয় কী করে! আরেকজন নিষ্ঠুর কমেন্টার নির্দ্বিধায় মন্তব্যে লিখে দিলেন ঠিকই- হা রে ভাই, বামা ফার্মেসি তো একটাই, রজত দা’র ভাই রমা…। আমার আর বোঝার কিছু বাকি রইলো না…।
গুনে দু’দিনও পেরোয়নি, সাংবাদিক শামস শামিমের ফোন- দাদা, রমা দা আপনার বন্ধু ছিলেন না! আপনার তো অনেক স্মৃতি আছে তাঁকে নিয়ে…! অন্ধ সাপুড়ের মতো আমি তখন স্মৃতি হাতড়াই…। সত্যিই কি তাই? খুঁজে ফিরি বন্ধুত্বের সংজ্ঞা…।
বন্ধুত্বের কি কোন সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা আছে? আমার জানা নেই। শুধু এটুকুই বুঝি, যেখানে কোনো বাধ থাকে না। তবু আমরা যখনই বন্ধুত্বের সম্পর্ক ও সংজ্ঞা নির্ধারণের চেষ্টা করি, সেখানে কাজ করে আমাদের দানা বাঁধা চিন্তার বোধ ও বুদ্ধি। সম্পর্কের নানান মাত্রা ও মাত্রিকতাকে যাচাই-বাছাইয়ের একটা নিজস্ব পরিশীলন অন্তলীন হয়ে জেগে থাকে সেখানে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট বোধোদ্গমের আগেই যে শৈশব-কৈশোরের সাথী-সম্পর্কগুলো তৈরি হতে থাকে সেখানে কি কোনো নিরীখ থাকে? একই পরিবারের পিঠাপিঠি ভাইদের মধ্যে যে সম্পর্ক তাকে কি বন্ধুত্ব বলে? মন তো সায় দেয় না। সেটা বন্ধুত্ব নয়, তার চাইতেও ভিন্ন, অন্যকিছু। শৈশবের খেলার সাথী থেকে কখন যে কৈশোরের অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে জড়িয়ে তা হয়ে যায় এমন এক সম্পর্ক যার কোন সংজ্ঞা নেই। বন্ধুত্বের ভাংচুর থাকে, কিন্তু জীবনের বহিঃক্ষেত্রের শুরুতেই শৈশব-কৈশোরের অদম্য সাথীরা এমনই এক বন্ধনে জড়িয়ে যায় যার আল্পনা রাঙানো থাকে জীবনভর। যেখানে থাকে না কোনো শ্রেণির বিভেদ, বৈদগ্ধের দেয়াল কিংবা সামাজিক শাসনের ভয়। এক দীর্ঘ জীবনের বিচ্ছেদের পরও একে অন্যের সাথে দেখা হয়ে গেলে কৈশোরের অমলিন ঘুড়িটা পতপত করে উড়তে থাকে বুকের অভিন্ন আকাশে। বুকের ভেতর তখন গুমড়ে ওঠে- বন্ধু, কতোদিন দেখি না তোকে, এতোদিন কোথায় ছিলি…।
রমা তো আমার সেই কৈশোরের ঘুড়ি, যেভাবে শঙ্কর, সাজু, দীপক, গেলমান, মঙ্গল এবং আরো আরো সাথীরা যাদের কারো কারো সাথে কৈশোর পেরুনো এই ভবঘুরে জীবনে আর দেখা হয়নি কথা হয়নি কখনো। ক্ষীণ আশা নিয়ে থাকি, হয়তো তাদের সাথে কখনো কোথাও দেখা হয়ে যেতেও পারে। কিন্তু রমার সাথে কি আর দেখা হবে কখনও!
এক জীবনের ঘাটে ঘাটে কত কেউ যে কাছে আসে, আবার চলেও যায়। কেউ কেউ থেকেও যায়। স্কুল জীবনের বন্ধু, কলেজ জীবনের বন্ধু, বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, কর্মজীবনের বন্ধু, পরিবার ও সমাজ জীবনের বন্ধু, গানের বন্ধু, প্রাণের বন্ধু, আদর্শের বন্ধু, প্রবাসের বন্ধু ইত্যাদি প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক কতো রকমফের। এদের অনেকেই হয়তো মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ভাবে। কিন্তু বাল্যবন্ধু, এক মায়াময় আয়নার নাম, যার দিকে তাকালে মানুষ ফিরে যায় তার উৎসের কাছে শিকড়ের কাছে। জীবনের কুঁড়িফোটা সাথীরা আমার, যার অন্যতম সহজ সরল একজন ‘বামা ফার্মেসির রমা’! তার সাথে আর দেখা হবে না কখনোই…।
কখন কিভাবে কোথায় রমার সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ তার দিনক্ষণ মিলানো আদৌ সম্ভব নয়। সে কি বয়সে কচিৎ বড় না ছোট ছিল তাও নির্ণিত হয়নি কখনও। শৈশবের কোন দিনক্ষণ থাকে না।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন দেশের অতি ছোট এক মহকুমা শহর সুনামগঞ্জের যুদ্ধবিধ্বস্ত চেহারাটা কেমন ছিল তা বলার মতো বোধ বুদ্ধি বা উপযুক্ত বয়স কোনোটাই ছিল না তখন। এখন যখন সময়ের অমোচনীয় দাগ মেখে অনেকটাই বড় হয়ে গেছি, বুঝতে পারি মানুষের জীবন তার আয়ুষ্কাল দিয়ে নির্ধারণ হয় না, বুকের ভেতর আবার কেঁদে ওঠে পুরনো যন্ত্রণাটাই। আমরা কি আদৌ এভাবে বড় হতে চেয়েছিলাম! আমাদের বড় হবার কষ্টগুলো কি এভাবেই হারানোর কষ্টের সাথে মিশে যায়? একজীবনের কষ্ট নিয়ে তোর কাছে তো একটিবার ক্ষমা চাওয়ার সুযোগটুকুও রাখলি না রে বন্ধু!
মনে পড়ে, আজ থেকে ঠিক দশবছর আগে এই সেপ্টেম্বর মাসেই এক অনাগত আশঙ্কা বুকে চেপে দীর্ঘবিরতিতে এই শহরে পা রেখে অন্যরকম তবু এরকমই এক কষ্টের বীজ অক্ষরে গেঁথে নিয়ে আমার প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘অদৃশ্য বাতিঘর’-এ তুলে রেখেছিলাম। রমা তো নিশ্চয়ই এ শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলো তখন। অথচ কী আশ্চর্য! সেই কষ্ট আর আজকের কষ্টে এতোটা বিস্ময়কর মিল এলো কী করে! বইটা উল্টে আবারো সেই কবিতাটি পাঠ করতে করতে এবার কেবল রমার মুখটাই ভেসে উঠছিল, সেই কিশোর রমা’র মুখ, না কি আমার নিজেরই মুখ! কেননা ওর বয়স্ক মুখটা তো দেখা হয়নি আমার!
‘মল্লিকপুর নতুন বাসস্ট্যান্ড থেকে রিকশায়/ হাসন নগর হয়ে সদর হাসপাতাল/ খুব একটা দূরে তো নয়-/ বৃদ্ধ ক্লান্ত পিতা শুয়ে আছেন রোগ শয্যায়/ চার নম্বর কেবিনের বেডে অবসন্ন একা।/ হয়তো পরিজন বেষ্টিত/ তবু জীবনের খাতায় নিঃসঙ্গ একাই;/ অনিবার্য বার্ধক্য মানুষকে এমন একা করে দেয়।
কৈশোরের পুরনো রাস্তা/ রিকশায় সওয়ারী আমি ছুটে চলি দিগি¦দিক/ পুরানো বাসস্ট্যান্ড ফেলে ট্রাফিক পয়েন্ট ঘুরে/ সোজা পথ চলে গেছে পাবলিক লাইব্রেরি হয়ে/ ভীষণ ব্যস্ত শহর তবু/ মনে হয় শীতের সুরমার নিস্তরঙ্গ বুকের মতোই/ কী যেন হারিয়ে গেছে/ সুউচ্চ দালান আর মার্কেটের ভিড়ে।
হারিয়েছে এ শহর মায়াময় শৈশব আর/ দুরন্ত কৈশোর তার-/ শহীদ মিনার আগের মতোই শুধু/ স্মৃতিময় কদম আর কৃষ্ণচূড়া নেই-/ পাশে পুরনো বালুর মাঠ এখন/ ঝলমলে বিশাল পৌরবিপণি বিতান।/ অতীতের চেনা চেনা মুখ বড়োই অচেনা ঠেকে আজ,/ তুখোড় যে যুবকেরা একদিন হৈ হৈ মাতাতো শহর/ এদিক ওদিক দেখি/ কেমোন ন্যুব্জ আর ঘোলাটে দৃষ্টিতে খোঁজে/ পুরনো স্বাক্ষর যতো/ হয়তো বা যা কিছুই অন্যের দখলে সবি;/ আহা, দিন বদলের কষ্ট খ-াতে পারে না কেউ।
বদলে গেছে কত কিছুই, রাস্তা-ঘাট-পুকুর-মাঠ/ ছোট্ট শহরে এতো পরস্পর পরিচিত মুখ/ সুখে দুখে হয়ে যেতো সবাই সবার/ সে সবই বদলে গেছে/ বদলে গেছে সময়েরা প্রজন্মের প্রজন্মের পর/ বদলে গেছে প্রিয়তম শহর আমার।
রুগ্ণ পিতা শুয়ে আছেন হাসপাতালের বেডে/ উকিলপাড়া বাঁয়ে রেখে তাড়াহুড়ো গন্তব্য আমার/ চমকে উঠি তীব্রতায় আকস্মিক ব্রেকের শব্দ/ হৈ হৈ করে ছুটে আসে পুরনো বন্ধু জমির/ স্কুলের সহপাঠী এককালের তুখোড় প্লেয়ার/ স্বভাবটা তেমনি আছে এতোকাল পর।/ হুড়হাড় কথার ফাঁকে চেয়ে থাকি অপলক/ দু’দিনের না-কামানো দাঁড়ি ধবধবে সাদা আর/ বয়েসটা ঝুলে আছে চামড়ার ভাঁজে;/ ওটা কি আমারই বিম্ব তবে ! হায়,/ আর যারা সহপাঠী কে কোথায় আজ ?/ বিপন্ন প্রশ্নগুলো নিরুত্তর কথা হয়ে/ জীবন্ত আয়নায় খোঁজে আপন আপন মুখ।
হাসপাতালে শুয়ে আছেন বৃদ্ধ পিতা/ অবসন্ন একা/ আপাতত ওটাই গন্তব্য আমার/ এবং একদিন আমাদের সবার…।’ (গন্তব্য/ রণদীপম বসু)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী