,

Notice :
«» শাবিতে ভর্তি পরীক্ষায় ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে প্রথম হয়েছে শাহিলা চৌধুরী «» জগন্নাথপুরে প্রবাসীর উদ্যোগে রাস্তায় মাটি ভরাট «» স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রয়াত সভাপতি রমা দাসের জন্মদিন পালন «» সামাজিক সম্প্রীতি বিষয়ক কর্মশালা «» হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের বাদাঘাট দক্ষিণ ইউনিয়ন কমিটি গঠন «» ধর্মপাশায় পূজা মণ্ডপ পরিদর্শন করেন রনজিত সরকার «» কাজ-না-করা সরকারি প্রতিষ্ঠান দেশের উন্নতিকে পিছনে টানে «» পণ্য প্রদর্শনী মেলায় নিম্নমানের পণ্যের দাম অধিক «» তাহিরপুর-মধ্যনগরে ব্যারিস্টার ইমনের মতবিনিময়: নির্বাচনী এলাকায় নতুন আলোচনা «» শিক্ষক সংকটে দক্ষিণ সুনাগঞ্জের অধিকাংশ বিদ্যালয় ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম

ঢল ও বর্ষণে আমনের সর্বনাশ : স্থানীয় ‘নাভিজা’ বীজই এখন ভরসা

শামস শামীম ::
‘বৈশাগ্যা ধানপানও পাইন্যে নিছে। ইবার, লাগানোর হঙ্গে হঙ্গে আগুন মাইয়া ধানও লইয়া গেছেগি। দুই কিয়ার জমিন বাকি আছিল। এখন হেই জমির জালাও পাইন্যে খাইয়া গেছে। এখন যাইতাম কোয়াই। কৃষকের মরা ছাড়া উপায় নাই’। নিজের বাড়ির সামনে ঢলের পানিতে তলিয়ে যাওয়া আমনধানি ক্ষেত দেখিয়ে অচিন্তপুর গ্রামের কিষানী জাইরুন নেছা (৪৫) এভাবেই তার ফসল ডুবে যাওয়ার বর্ণনা দেন ছলছল চোখে।
শুধু জাইরুন নেছাই নয় গত ১১ আগস্ট থেকে সপ্তাহব্যাপী নামা পাহাড়ি ঢল ও বর্ষণে সরকারি হিসেবে সুনামগঞ্জ জেলায় তলিয়ে গেছে ৯ হাজার ২২৩ হেক্টর রোপা আমন জমি। তবে বেসরকারি হিসেবে অন্তত ১৫ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন তলিয়েছে। ধান লাগানোর শেষে ঢলের পানিতে ফসল ও বীজতলা তলিয়ে নেওয়ায় এবং বিএডিসির কাছে আমনের কোন বীজ না থাকায় উদ্বিগ্ন কৃষি বিভাগ। তাই স্থানীয় কৃষকদের কাছে থাকা ‘নাভিজা’ (বিলম্বে ফলে স্থানীয় জাত) বীজই এখন কৃষি বিভাগের কাছে ভরসার নাম। সংশ্লিষ্টরা পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে এই বীজ নতুন করে লাগানোর পরামর্শ দিচ্ছেন কৃষকদের। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী নেত্রকোণা জেলার মোহনগঞ্জ এলাকা থেকেও বীজগাছ আনার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১১ উপজেলার মধ্যে কমবেশি সব উপজেলায়ই আমন চাষ হয়ে থাকে। তবে বেশি চাষ হয় সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার এবং ছাতক উপজেলায়। জেলায় দুই লাখ আমনচাষী রয়েছে। চলতি মওসুমে ৬১ হাজার ৬৯৪ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হলেও ঢল ও বর্ষণের আগ পর্যন্ত চাষ হয়েছে ২৭ হাজার ৩৩৭ হেক্টর। এর মধ্যে ১১ আগস্ট থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত নামা টানা ঢল ও বর্ষণে জেলার এসব উপজেলার রোপনকৃত আমন জমি সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়েছে। সরকারিভাবে বলা হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৯ হাজার ২২৩ হেক্টর জমি। সংশ্লিষ্টরা বাকি জমি চাষ করার কথা বললেও বাস্তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রোপা আমনের জমির সঙ্গে বীজতলাও সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। তাই আমনক্ষেত এবার পতিত থাকার আশঙ্কা করছেন কৃষক। কিছু সচ্ছল কৃষকের কাছে ‘নাভিজা’ বীজ থাকলেও ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের কাছে সেই বীজ নেই বলে জানা গেছে।
কৃষি বিভাগের মতে জেলায় চলতি মৌসুমে ৩ হাজার ৬১০ হেক্টর বীজতলা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ৪ হাজার ৮৮৭ হেক্টর বীজতলা তৈরি হয়েছিল। সূত্রমতে পাহাড়ি ঢলে ১২ হাজার হেক্টর বীজতলা নষ্ট হয়েছে। চলতি মাস পর্যন্ত বীজতলা লাগানোর সময় এখনো রয়েছে বলে কৃষকদের জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। তবে বীজতলা তলিয়ে যাওয়ায় এবং বিএডিসি’র সরকারি বীজ গুদামে বীজ না থাকায় বীজতলা তৈরির পথ খোলা নেই কৃষকের সামনে। এই অবস্থায় কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন বিলম্বে চাষ হয় (নাভিজা) দেশি প্রজাতির চিনাশাইল, নাজিরশাইল, মালতি, চেঙ্গের মুড়ি, কালোজিরা, চাপলাশ, বিরুইনসহ বেশ কিছু ধানের দেশি বীজ অনেক সচ্ছল কৃষকের সংগ্রহে রয়েছে। সেই বীজ লাগানো হলে অবশিষ্ট জমি ও নষ্ট হওয়া জমি আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রোপা আমন লাগানো যাবে। এতে ফলন কিছু কম হলেও কৃষকদের ক্ষতির মাত্রা কমবে বলে সূত্র জানায়। তাছাড়া বিআর ২২, ২৩, ব্রি ৪৬ ও বিনা ১৬ উফশি ধানও বিলম্বে লাগানো যায়। এখন ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কৃষি বিভাগ কৃষকদের নিজের সংগ্রহে থাকা এই ‘নাভিজা’ ধানবীজ তৈরির আহ্বান জানাতে দেখা যাচ্ছে।
অচিন্তপুর গ্রামের প্রান্তিক চাষী আব্দুল গফফার বলেন, ‘অফিস তকি ১৪ শ টাকার বীজ কিইন্যা আইন্যা ছাড়া লাগাইছলাম। তিন কিয়ার জমি মেশিন দিয়া আল বাইয়া তইছলাম। এর মধ্যে বন্যা আইয়া তল কইরা নিয়া গ্যাছে। পাইন্যে জালাও নষ্ট কইরা গেছে। এখন কোনখানই বীজ পায়রামনা। ইবার আওরের লাখান আমনও নষ্ট অইল’।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের কৃষক সুরুজ আলী বলেন, এমন উপর্যুপরি দুর্যোগের মুখে নিকট অতীতে কখনো পড়েনি এই অঞ্চলের কৃষক। হাওরের ধান-মাছ নষ্ট হওয়ার পর কৃষক স্বপ্ন দেখছিল আমন ধান দিয়ে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নিবে। কিন্তু সেটাও আর অবশিষ্ট রইল না। এ বছর কৃষকের মেরুদ- ভেঙ্গে গেছে। কৃষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার দাবি জানান এই কৃষক। তিনি জানান, কোন ধরনেই বীজই তার সংগ্রহে নেই।
‘হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও’ আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, জেলার সম্পূর্ণ বোরো ফসল গত এপ্রিলে তলিয়ে গেছে। ফসলহারা কৃষক ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি রোপা আমন চাষের মাধ্যমে। কিন্তু রোপা আমন ধান লাগানোর সাথে সাথেই বন্যায় সেই আশাও খরকুটোর মতো ভেসে গেছে। আমরা এই অবস্থায় সরকারের সংশ্লিষ্টদেরকে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার লিখিত দাবি জানিয়েছি।
সুনামগঞ্জ বিএডিসির সহকারি পরিচালক মো. আওলাদ হোসেন বলেন, আমাদের সুনামগঞ্জে বিএডিসির গুদামে কোন আমনধানের বীজ নেই। থাকলে কৃষকদের মধ্যে বিতরণের উদ্যোগ নিতাম আমরা।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জাহেদুল হক বলেন, বন্যায় প্রায় ৯ হাজার হেক্টরেরও বেশি আমন জমি নষ্ট হয়েছে। বীজতলা নষ্ট হয়েছে ১২শ হেক্টর। ধানের পাশাপাশি বীজতলা ডুবে যাওয়ায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। সরকারি গুদামেও বীজ নেই। তাই কৃষকদের কাছে থাকা কিছু নাভিজা বীজই আমাদের ভরসা। আমরা মাঠকর্মীদেরকে নির্দেশনা দিয়েছি কৃষকদের কাছে থাকা এই বীজ দ্রুত লাগানোর জন্য। দ্রুত সময়ে লাগানো হলে নিমজ্জিত জমি ও অবিশষ্ট জমি চাষের আওতায় আনা সম্ভব। এতে ক্ষতি কিছুটা হলেও পোষানো সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী