,

Notice :

দেশের স্বার্থে কৃষকদের বাঁচাতে হবে : এএইচএম ফিরোজ আলী

কৃষি প্রধান বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নয়নের চাবি বা মেরুদ- হচ্ছে- এদেশের কৃষক সমাজ। আদি মানুষের পেশা ছিল কৃষি। আমাদের অধিকাংশ মানুষের বাপ-দাদার পেশাও কৃষি। কৃষির উপরই আমাদের নির্ভরতা। কৃষককের উন্নতি মানে দেশের উন্নতি, অগ্রগতি এবং সমৃদ্ধি। কৃষকের ক্ষতি মানে দেশের ক্ষতি। শিল্প উন্নত দেশ গড়তে হলে কৃষির উপকরণ ছাড়া শিল্প কারখানা অচল। কিন্তু যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা মানব সৃষ্ট দুর্যোগের কারণে কৃষকের সোনার ফসল ও সহায় সম্বল হারিয়ে কৃষক নির্বাক, নিঃস্ব হয়ে পড়েন, তখন হৃদয়বান মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়, কৃষক-কৃষাণীর বেদনার সুর মানব অনুভূতিকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। তারপরও পাঁজরের হাড় ভাঙা এ দুর্বিষহ, দুঃসহ দুর্বিনীত যন্ত্রণার আঘাতকে মানুষ প্রত্যাঘাত করতে পারে না। মানুষ একে নিয়তির তকদীরের লিখন বলে মানতে বাধ্য হয়।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকা সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ এ ৮টি জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অতিবৃষ্টি এবং উজান থেকে আসা ঢলে সোনার সমতুল্য ফসল বোরো নষ্ট করে দিয়েছে। শুধু ফসল নয় ক্ষতি হয়েছে মাছ, হাঁস, জলজ প্রাণীর। সব মিলিয়ে হাওর পাড়ের কৃষক ও তাঁদের পরিবার এখন বড় অসহায়। তাঁদের কিছুই নেই, তারা নিঃস্ব, তারা জীবনমৃত, পেটে ভাত নেই, হাতে নগদ টাকা নেই, কাজও নেই, হাওরে মাছও নেই। মাছ মরে ভেসে গেছে। কৃষকদের বাঁচার আকুতি, আর্তনাদ, বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মানুষের দুর্গতি বিপর্যয় নিজ চোখে না দেখলে কেউ কথায় বিশ্বাস করার মত নয়। হাওর অঞ্চলের হাট বাজারে ব্যবসা একেবারে মন্দা। দাদন ব্যবসায়ীদের ভয়ে কৃষকদের শরীরের ক¤পন কমছে না। ফসল হারানোর পর গত ৩০ এপ্রিল রোববার দিবাগত রাতে ঘণ্টাব্যাপী ঘূর্ণিঝড়ে মানুষের কাচা, আধা পাকা, টিনের ঘর, বাঁশ বেতের এবং ছনের ছাউনীর শত শত ঘর উড়িয়ে নিয়েছে। হাওরের ঢেউ আর তুফান একত্রিত হয়ে মাটির বাড়ি ঘর ধ্বংসে করে দিয়েছে। এমন ঝড় আগে কেউ দেখেনি।
আমিও হাওর পাড়ের ছেলে। এ ঝড়ের তাণ্ডব দেখে মনে হয়েছিল হয়তো আর বাঁচার কোন উপায় নেই। পরদিন দেখা গেল সর্বত্র গাছ, বাশঝাঁড়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রবি শস্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অভাবী মানুষের অবস্থা দেখে নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়েছে। মানুষের জন্য যেন করার কিছুই নেই।
গণমাধ্যমের তথ্য মতে বাংলাদেশে ৪৭টি বড় হাওর এবং বিভিন্ন মাপের ৬হাজার ৩০০টি বিল ও বাওর রয়েছে। এসবের মধ্যে বৃহত্তর সিলেটের শনির হাওর, হাকালুকির হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, নলুয়ার হাওর, পাকনার হাওর, কাওয়া দীঘি, চাউলধনীসহ ছোট বড় মিলিয়ে ৪২৩টি হাওর এবং ৫২টি বাওরসহ অসংখ্য বিল জলাশয় বা জলাভূমি রয়েছে। সিলেট অঞ্চলের হাওরগুলোর আয়তন প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার। হাওর পারে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি। এদের প্রায় ৯৫ভাগ মানুষের পেশা কৃষি এবং একমাত্র বোরো ফসলের উপর নির্ভরশীল। হাওর অঞ্চলে প্রায় ৩লাখ ৩৪ হাজার ৯৫ হেক্টর জমির ফসল পানিতে ডুবে গেছে। হাওর ছাড়া সিলেট অঞ্চলে আমন জমিতে প্রায় আরো ১লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ফসল করা হয়। যা স¤পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
সিলেট বিভাগের বিশাল এলাকায় প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ফসল উৎপাদন করা হয়। প্রাকৃতিক কোন দুর্যোগে ফসল নষ্ট না হলে প্রতি বছর ১৫-২০ লাখ টন ধান কৃষকের ঘরে ওঠে। কৃষি বিভাগের হিসাব মতে সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভী বাজার এ চার জেলায় খাদ্যের চাহিদা মিটিয়ে বছরে প্রায় ৯ লাখ টন খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে যা অন্য জেলায় যোগান দেয়া সম্ভব হয়। সিলেটে শুধু বোরো ফসল নষ্ট হয়নি। শীত মৌসুমের প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় শীতকালীন সাক-সবজি এবং রবি শষ্য ফসলও নষ্ট হয়েছে। গোটা হাওর অঞ্চলে এক মহাবিপর্যয় ঘটেছে। আগামী ৫/৬ বছরে চলতি বছরের ক্ষতি কোন মতেই পূরণ করা সম্ভব হবে না কৃষকের। জীবন বাঁচার তাগিদে হালের গরু, মহিষ, ভেড়া, ছাগল, হাঁস, মুরগী পানির দামে বিক্রি করেছেন কৃষক।
কাগজে কলমে যাই বলা হয় না কেন, বাস্তবে সিলেটে সরকারি বেসরকারি ব্যাংকগুলো কৃষকদের কৃষি ঋণ দেয় না। ময়লা কাপড় চোপড় পরে আসা কৃষকদের ব্যাংক কর্মকর্তারা পছন্দ করেন না।
স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে কেউ কেউ কৃষি ঋণ পেয়ে থাকলেও এদের সংখ্যা খুবই কম। সারা দিন ক্ষেতে খামারে কাজ করা কৃষক অনেক সময় ব্যাংকে যাওয়ার সাহসও পায় না। সুনামগঞ্জের কৃষকরা অনেকেই ঝামেলা এড়াতে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ না করে গ্রামীণ দাদন ব্যবসায়ীর নিকট থেকে চড়া সুদে টাকা নিয়ে ফসল ফলান। ধান পাকার আগেই দাদন ব্যবসায়ীরা বিঘা প্রতি ধানের হিসাব দিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত দেখা যায় এত কষ্ট আর পরিশ্রমের ফসল অর্ধেকই নিয়ে যায় দাদন ব্যবসায়ীরা। এদেশে সর্বক্ষত্রে খোররা রাজত্ব করে। ঘুষখোরদের কারণে বড় অংকের অর্থ বরাদ্দ থাকলেও নির্মাণ করা হয়নি হাওর রক্ষা বাঁধ। সব টাকা শেষ হয়েছে ভাগ বাটোরার মাধ্যমে। তবে এবার রেহাই নেই।
বাঘে ধরলে ছেড়ে দেয়, কিন্তু শেখ হাসিনায় ধরলে ছাড়েন না। দুদক কয়েকজন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। পত্রিকায় দেখলাম তাঁরা বাঁধ নির্মাণের অনিয়ম দুর্নীতির কথা স্বীকার করেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাকে দুর্গত ঘোষণার দাবির প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনের ২২ধারার অযুহাত দেখিয়ে অর্ধেক মানুষ মরার কথা বলে যে উষ্মা প্রকাশ করেন এবং একটি ছাগলও মারা যায়নি বলে এতো বড় বিপর্যয়কে ছাগলের সঙ্গে তুলনা করায় ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই।
বানের পানির চেয়ে হাওর রক্ষা বাঁধ র্নিমাণকারীরা কৃষক ও দেশের এ ক্ষতির জন্য শতভাগ দায়ী। এটা মানবসৃষ্ট দুর্যোগ। হাওরপাড়ের মানুষের ফসলহানির খবর পেয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতি এডভোকেট আব্দুল হামিদ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, কৃষিমন্ত্রী অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, পানিস¤পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদও স্থানীয় এমপি সহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কৃষকের অবস্থা সরেজমিনে দেখে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছেন।
বাংলাদেশের মানুষ প্রতি মুহূর্তে দুর্যোগ মোকাবেলা করে বাঁচতে হচ্ছে। বন্যাসহ অনেক প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখেছি। কিন্তু এবারের মত গণমাধ্যমে বোরো ফসল হানির সচিত্র সংবাদ এবং এত বেশি প্রচার-প্রচারণা আর জীবনে কোনদিন দেখিনি। বিষয়টি খুব প্রশংসনীয় মনে হয়েছে। জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় স¤পাদকীয়, উপস¤পদকীয় ও নিবন্ধ লিখে দুর্গত এলাকার মানুষের অবস্থা জানানো হয়। কৃষকের পুনর্বাসন কর্মসূচির কথা বলা হয়েছে।
ভাটি অঞ্চলে স্থায়ী বন্যার সমস্যা সমাধানের জন্য দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে নদী খননের মাধ্যমে উঁচু করে নদীর তীর সংরক্ষণ, খাল-বিল খনন, দ্রুত কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি শুরু, বিদ্যুৎ বিল ১ বছরের জন্য মওকুফ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে নির্মাণ, শিক্ষার্থীদের শতভাগ উপবৃত্তি প্রদান, বেতন মওকুফ, সকল বিল, হাওর ইজারা মুক্ত করা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যক্রম বাতিল, সকল দপ্তরে সিলেটের শূন্য পদে লোক নিয়োগ, কৃষি ঋণের সুদ অর্ধেক নয় পুরো মওকুফ, বিনা শর্তে কৃষকদের সরাসরি ঋণ প্রদানের নির্দেশ, হয়রানি বন্ধ, দাদন ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ, মাছের পোনা অবমুক্ত, ভিজিএফ, ভিজিডি কার্ড চালু, কুটির শিল্পের ঋণ প্রদানের মাধ্যমে নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে ক্ষতিগ্রস্ত হাওর পাড়ের মানুষ যেমন বাঁচানো যাবে না, তেমনি দারিদ্র বিমোচন কর্মসূচি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা দূর করে নজির সৃষ্টি করেছেন। হাওর অঞ্চলের মানুষকে বাঁচিয়ে আপনি বঙ্গবন্ধুর মত উদার হৃদয়ের পরিচয় দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সবকিছু করবেন এটা আমার বিশ্বাস করি।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী