শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১১:৫০ অপরাহ্ন

Notice :

মৌলবাদী জঙ্গিত্বের অস্তিত্ব নির্মূল করতে হবে

গতকাল জাতীয় দৈনিকগুলোর একটা সংবাদ ছিলÑ প্রধান বিচারপতি ও আইজি প্রিজনের গ্রামের বাড়িতে নিরাপত্তা প্রদান সংক্রান্ত। সমকালে লিখা হয়েছেÑ “মানবতাবিরোধী অপরাধী মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদন্ড কার্যকরের প্রস্তুতিতে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ও কারা মহাপরিচালক (আইজি প্রিজন) বিগ্রেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিনের গ্রামের বাড়িতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।” এই সংবাদ সাধারণ মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। একজন দেশদ্রোহী, মানবতাবিরোধী অপরাধী অর্থাৎ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীর যথাযথ বিচার প্রক্রিয়া অবলম্বনের মাধ্যমে নির্ধারিত দন্ড (মৃত্যুদন্ড) কার্যকর করার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ দেশের ভেতরে সন্ত্রাসী আক্রমণের আশঙ্কা করা হচ্ছে। সত্যিকার অর্থেই অবাক করার বিষয় যে, একজন চিহ্নিত অপরাধী, প্রকৃতপক্ষে যে একজন দেশদ্রোহী, সোজা কথা বলতে গেলে, পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তির ক্রীতদাস, তার সমর্থনে দেশের ভেতরে সন্ত্রাসী আক্রমণ চালানোর মতো অনুসারী আছে। বাংলাদেশ ছাড়া বিশ্বের আর কোথাও স্বাধীনতাবিরোধী অপরাধীর পক্ষে সক্রিয় এমন মৌলবাদী জঙ্গিত্বের অস্তিত্ব আছে বলে মনে হয় না।
বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যে দেশটি বিশ্বের সকল দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধর্মপ্রাণ মানুষের দেশ। কিন্তু তারা ১৯৭১-য়ে প্রায় সকলেই, শতকরা নিরান্নব্বই ভাগ লোক, জাতিগত অস্তিত্বরক্ষার প্রশ্নে পাক-বাহিনীর আক্রমণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ছিল। পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সেদিনের বাংলাদেশের যুদ্ধ করাটা ছিল রাজনীতিক বিজ্ঞান অনুসারে বিশ্বের যে কোন আইন ও নৈতিকতার মাপকাঠিতে ন্যায়যুদ্ধ, এতে একটুকুও অন্যায় ছিলো না। বরং যারা একাত্তরে পাক-বাহিনীর সহযোদ্ধা ছিল, আসলে তারাই ছিল অন্যায়কে অবলম্বনকারী, দেশদ্রোহী, যুদ্ধাপরাধী জাতীয় কুলাঙ্গার। তারা সেদিন গণতান্ত্রিক উপায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষমতারোপের প্রক্রিয়াকে ভন্ডুল করে হয়ে উঠেছিল অগণতান্ত্রিক এবং দেশের ভেতরে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করে সমাজবাদের ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছিল, হয়ে উঠেছিল মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধী। মৃত্যু মানুষকে প্রফুল্ল করে না, নিজামীর মৃত্যুদন্ডেও আমরা প্রফুল্ল নই কিন্তু আমরা স্বস্তি পেয়েছি স্বস্তি পেয়েছে দেশের মানুষ। আর অনুভব করছি জাতির সঙ্গে বিশ্বঘাতকতা করার বিচার করতে না পারার জাতিগত কলঙ্ক বিমোচনের প্রশান্তি। বিশ্বসভায় জাতিগতভাবে সগৌরবে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণার এর চেয়ে উৎকৃষ্ট আর কোনও কীছু নেই।
যে কেউ ক্রীতদাস হয়ে জন্মাতেই পারে। অতীতে একসময় এরকম হতো। ক্রীতদাস হয়ে জন্মানোতে কোনও দোষ নেই। নিজামীরা প্রকৃতপ্রস্তাবে জন্মসূত্রে ক্রীতদাস নয়। তারা স্বাধীন মানুষ হয়েই জন্ম নিয়েছিল এই দেশে, এই জাতির (বাঙালি) মধ্যে। কিন্তু তারা নিজেরা বিদেশি শক্তির, বিজাতির ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছিল চিন্তা ও চেতনায় নিজের স্বাধীনতা প্রচেষ্টাকে পরিহার করেছিল আর স্বীয় দাসত্বকে নীতিগতভাবে ন্যায্যতা দিতে ও শোভন করে তোলতে আদর্শিক সংগ্রামে ব্রতী হয়েছিল, যে আদর্শিক সংগ্রাম যে কোনও বিবেচনায় অন্যায় ও মানবতাবিরোধী কাজ, জঘন্য অপরাধের চেয়েও বেশি কীছু। যে আদর্শ ত্রিশ লক্ষ মানুষের প্রাণ হরণ করে, চার লক্ষ নারী ধর্ষণ করে, সাড়ে সাত কোটি মানুষের ৫৪ হাজার বর্গমাইলের জনপদকে মৃত্যু-উপত্যকায় পরিণত করে, সেটা কী করে আদর্শ হয় কীছুতেই তা বোধগম্য নয়। আর এটাকে কী করেই বা রাজনীতি বলা যায়?
এমন ক্রীতদাসের প্রতি, যে ক্রীতদাস অন্য দেশ (পাকিস্তান) অন্য জাতির কাছে নিজের দেশ ও জাতিকে শাসন ও শোষণের জন্য তোলে দিতে চায়, ঔপনিবেশিকতা শৃঙ্খলে আবদ্ধ করতে চায় স্বমাতৃভূমিক, সে বিশ্বাসঘাতকের জন্য জাতির হৃদয়ে ক্রোধ, ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা ছাড়া আর কীছুই অবশিষ্ট থাকে না।
প্রকৃতপ্রস্তাবে এই সব স্বজাতিদ্বেষী, পরদেশের ক্রীতদাসে মনোভাবাপন্ন বিশ্বসঘাতকরা যুগে যুগে বাংলাদেশ ও বাঙালির মধ্যে আবির্ভূত হয়েছে এটাই ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়ম। এবং এই স্বাভাবিক নিয়মেই দেখা যায় বাংলাদেশ আছে বাংলাদেশেই, বাঙালি রয়ে গেছে বাঙালিই। আর কালের নিয়মে আমরা পেয়েছি রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দ-সুকান্ত-শামসুরকে আর পেয়েছি তিতুমীর-সূর্যসেন-শেখ মুজিবকে। পেয়েছি শেখ হাসিনাকে। বাংলা কোনও দিন কোনও মীরজাফরকে তার সূর্যসন্তানের মর্যাদা দেয়নি আর দেবেও না। সব দেশে কুলাঙ্গারদের জন্য ইতিহাস বড় নির্মম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী