রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ০৪:১৬ পূর্বাহ্ন

Notice :

হতদরিদ্রদের আইনগত সহায়তা প্রদান নিঃসন্দেহে মহতী উদ্যোগ : হোসেন তওফিক চৌধুরী

আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান এবং সকলেই সমানভাবে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারী। আইনের দৃষ্টিতে উঁচুনিচু, ধনী-গরিব এবং কোন আশরাফ-আতরাফ নেই। কিন্তু যুগযুগ ধরে দেশের দারিদ্রতা, অস্বচ্ছলতা এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থায় টানাপোড়েনের জন্যে আইনের সুফল প্রাপ্তির আইনকারী হওয়া সত্বেও বিপুল জনগোষ্ঠী ন্যায়বিচার লাভ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মূলনীতি এদেরকে কোনভাবেই সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারেনি। এদের জীবনে বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কেঁদে ফিরত। কিন্তু একটি জনকল্যাণকামী ও উন্নয়নমুখী দেশে তো এ অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। আমাদের দেশ একটি গরিব দেশ। বিপুল পরিমাণে জনসমষ্টি দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে। এদের জীবনে প্রতিনিয়ত আইনগত সমস্যা লেগে রয়েছে। কিন্তু এই হতদরিদ্র অসহায় ও গরিব মানুষ আইনের সুফল পাওয়ার পূর্ণ অধিকারী হওয়া সত্বেও আর্থিক কারণে সুফল প্রাপ্তি থেকে অনেক অনেক দূরে ছিলেন। এহেন অবস্থায় এরা চোখের জল ফেলতেন। একমাত্র আল্লাহর কাছে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির জন্য দোয়া করা ছাড়া এদের আর কোন গত্যন্তর ছিল না।
আমাদের দেশ একটি জনকল্যাণকামী ও জনকল্যাণমুখী দেশ। সরকার এই অবস্থার নিরসনকল্পে কর্মপদ্ধতি নিয়ে এগিয়ে আসার চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন। এই প্রেক্ষাপটেই নিঃস্ব, অসহায় ও দরিদ্র বিচারপ্রার্থী জনগণকে সরকারিভাবে আইনগত সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকার “আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০” প্রণয়ন করে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা নামে একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানে দেশের সকল জেলায় এ সংস্থার অফিস স্থাপন করে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে লিগ্যাল এইড কমিটি করে অসহায় ও দরিদ্র বিচারপ্রার্থী জনগণকে সরকারি ব্যয়ে আইনি সেবা প্রদান করা হচ্ছে। লিগ্যাল এইড অফিসে সার্বক্ষণিকভাবে একজন সিনিয়র সহকারি জজ পদমর্যাদার কর্মকর্তা অসহায় ও দরিদ্র জনগণকে আইনি পরামর্শসহ সবধরনের সেবা দিয়ে আসছেন। আদালত সমূহে এদেরকে আইনগত সহযোগিতার জন্য আইনজীবী প্যানেল প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই বিজ্ঞ আইনজীবীরা এদের মামলা-মোকদ্দমা পরিচালনা করে আইনের সুফল এনে দিয়ে এদের মুখে হাসি ফুটাচ্ছেন। একমাত্র আর্থিক কারণে আইনি অধিকার পেয়ে নিজেদেরকে ভাগ্যবান ভাবছেন। যারা স্বপ্নেও ভাবেনি আইন তাদের পাশে দাঁড়াবে আজ আইন তাদের দোরগোড়ায়। আইনগত সহায়তা পেয়ে তারা আইনের সুফল পাচ্ছেন। প্রায় সকল আদালতেই এই আইন কার্যকরী করা হয়েছে। মহামান্য সুপ্রীমকোর্টেও এই আইনের পরিধি বিস্তৃত করা হয়েছে। তবে এই আইনের পরিধি আরো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলেও ওয়াকেবহাল মহল মনে করেন। কারণ আমাদের দেশে নুন আনতে পান্তা ফুরায় মানুষের জন্য আইনগত সহায়তা না দিলে বিরাট জনসমষ্টি আইনের অধিকার প্রাপ্তি থেকে দূরেই থেকে যাবে। এ ধরনের একটি আইন প্রণয়ন করে আমাদের বিচার ব্যবস্থায় এক নবযুগের সৃষ্টি করা হয়েছে। সরকারি আইনগত সহায়তা প্রদান একটি সেবাধর্মীও জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি। এই কর্মসূচি একটি মহতী উদ্যোগ। বিশ্বের অনেক দেশেই এ ধরনের কর্মসূচি নেই। এ দিক দিয়ে আমাদের দেশ অনন্য এবং আমাদের মতো অনেক গরিব দেশের জন্য পথপ্রদর্শক। তবে এই মহতী কর্মসূচি বাস্তবায়নের ব্যাপারে আইন সহায়তা প্যানেলের বিজ্ঞ আইনজীবীদের কার্যকারিতা ও ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি নিবেদিতভাবে আন্তরিকতা দিয়ে হতদরিদ্র, অসচ্ছল গরিবদের মামলা-মোকদ্দমা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করেন তাহলে এই মহতী কর্মসূচির সফলতা অর্জিত না হয়ে পারে না। এই আইনের মূলমন্ত্র হচ্ছে “গরিব দুঃখীর মামলার ব্যয়, সরকার দেয়”। গরিবের মামলার ব্যয় বহন করবে সরকার। দেশে আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় এই আইন এক দৃঢ় পদক্ষেপ। এই আইনই আইনগত ক্ষেত্রে সকলকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে। সেজন্য বলা যায়, এই আইন একটি মহতী উদ্যোগ। আমাদের আইন ব্যবস্থায় এক নবযুগ ও নবদিগন্তের সূচনা করেছে।
[লেখক : সিনিয়র আইনজীবী ও কলামিস্ট]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী