শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১০:৫৮ অপরাহ্ন

Notice :

মোট চাষের অর্ধেক ক্ষতি :কৃষি বিভাগের প্রতারণা থামেনি

শামস শামীম ::
বোরো ভান্ডার দেখার হাওর তলিয়ে যাওয়ার আগেই জেলার বিভিন্ন হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন ফোরামে হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের ক্ষতির পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন। তাঁরা ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এবং সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে বিভিন্ন ফোরামে জানান, শিলা, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার হেক্টরের বোরো ধান তলিয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেখার হাওর, খরচার হাওর, বরাম হাওর, চাপতির হাওর, ছায়ার হাওর, ধর্মপাশা ও দোয়ারাবাজারের একাধিক হাওর তলিয়ে যাওয়ার পর সম্পূর্ণ ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষ হেক্টরেরও বেশি।
গত ২৫ অক্টোবর জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় হাওরের ক্ষতি নিয়ে কৃষি বিভাগের লুকোচুরি ও কৃষকের সঙ্গে ‘প্রতারণা’র বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্বের সঙ্গে আসেন স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে। নানাভাবে কৃষকের পক্ষে সংহতি জানিয়ে প্রকৃত ক্ষতিপূরণ তৈরির আহ্বান জানানো হলেও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঘরে বসে মনগড়া ক্ষতির প্রতিবেদন তৈরি করে কৃষকের সঙ্গে প্রতারণা করছে। তারা প্রকৃত তথ্য গোপন করায় কৃষকরা ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হবেন।
কৃষক ও জনপ্রতিনিধিরা জানান, গত সপ্তাহে দেখার হাওর ও খরচার হাওর তলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। উঁচু এলাকায় যেসব জমি ছিল তার ধানও কাটতে পারেননি কৃষক। চোখের সামনেই তলিয়ে গেছে তাঁদের ফসলি জমি। ধান গোলায় তোলার জন্য যে ধানখলা তৈরি করেছিলেন ধানের সঙ্গে ধানখলা ও খলাঘরও তলিয়ে গেছে ঢলের পানিতে। কৃষকরা বছরের খোরাকিই তোলতে পারেননি। সর্বসাধারণের চোখে ফসলের ক্ষতি ভাসলেও দৃশ্যমান সেই ক্ষতি চোখে দেখছেনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ নির্মাণের দুর্নীতি ও অনিয়মকে ঢাকতে তারা ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে দেখাচ্ছে বলে কৃষক ও জনপ্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, তাদের হিসেবে এ পর্যন্ত মাত্র ৩৩ হাজার হেক্টর জমির ক্ষতি হয়েছে। দেখার হাওর, খরচার হাওর এবং শনির হাওরের কিছু জমির ক্ষতি হয়েছে বলে তাদের পরিসংখ্যানে উল্লেখ করে। ক্ষতিগ্রস্তদের মতে বাস্তবে গত সপ্তাহেই শনির হাওরের ৯৫ ভাগ ফসলের ক্ষতি হয়েছে। দেখার হাওরের তিনভাগের দুই ভাগ ফসলের ক্ষতি হয়েছে চলতি সপ্তাহে। খরচার হাওরের অর্ধেকেরও বেশি ক্ষতি হয়েছে চলতি সপ্তাহে। এর আগে জগন্নাথপুর, ধর্মপাশা, দিরাই উপজেলায় প্রায় অধের্কেরও বেশি ফসলের সম্পূর্ণ ক্ষতি হয়েছে। কৃষক ও জনপ্রতিনিধিদের মতে সর্বমোট ক্ষতির পরিমাণ মোট চাষের অর্ধেকেরও বেশি। তাদের হিসেবে ক্ষতির পরিমাণ ১৫শ কোটি টাকা। কৃষি বিভাগের মতে ক্ষতির পরিমাণ মাত্র ৩শ কোটি টাকা।
গত ২৪ এপ্রিল তাহিরপুরে উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিবৃন্দ তাহিরপুরেই ১৫০ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে লিখিত বক্তব্যে জানান। এক সংবাদ সম্মেলনে তারা কৃষি বিভাগ ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে দেখানোর পাঁয়তারা করছে বলে অভিযোগ করেন। ক্ষতি কমিয়ে দেখালে কৃষি বিভাগের বিরুদ্ধে সভায় আন্দোলনেরও ডাক দেন তাঁরা। গত ২৪ এপ্রিল রাতে দেখার হাওরের তিনভাগের দুই ভাগেরও বেশি ফসল সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২শ কোটি টাকারও বেশি। ওই হাওরের উঁচু এলাকার জমির ধানই কাটতে পারেননি কৃষক। ক্ষয়-ক্ষতি দৃশ্যমান হলেও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা বাস্তব থেকে দূরে গিয়ে মনগড়া মিথ্যা প্রতিবেদন পাঠাচ্ছেন।
দেখার হাওরের গোবিন্দপুর গ্রামের কিষাণী নেকজান বিবি জানান, তিনি ১০ কেয়ার জমির মধ্যে মাত্র ৩ কেয়ার জমির ধান কাটতে পেরেছিলেন। ধান তৈরির জন্য যে খলা তৈরি করেছিলেন দুই কেয়ার জমির কাটা ধানসহ পরদিন খলাঘরও তলিয়ে গেছে। তিনি জানান, এই গ্রামের কোন কৃষকই বছরের খোরাকি সংগ্রহ করতে পারেনি। তাদের তিনভাগের মধ্যে দুই ভাগেরও বেশি ফসল তলিয়ে গেছে।
সদর উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নিগার সুলতানা কেয়া বলেন, দেখার হাওরের কৃষকরা যখন ধানখলা তৈরি করে গোলায় ধান তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখনই হাওরে পানি ঢুকে ফসল তলিয়ে নিয়ে যায়। উঁচু জমির ইরিধানও রেহাই পায়নি। এই হাওরের কৃষকরা তিনভাগের মধ্যে দুই ভাগেরও বেশি ফসল হারিয়েছেন। এই হাওরের প্রায় ২শ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি জানান।
জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারমান মুক্তাদীর আহমদ বলেন, চৈত্র মাসের প্রথম সপ্তাহেই শিলাবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা এবং বাঁধ ভেঙে উপজেলার প্রায় ১০ হাজার হেক্টরের জমির ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। কিন্তু কৃষি বিভাগ এই ক্ষতি লুকিয়ে মাত্র ১ হাজার হেক্টরের ক্ষতি হয়েছে বলে মিথ্যা ও মনগড়া প্রতিবেদন দিচ্ছে। কৃষি বিভাগের এই মিথ্যাচারের কারণে কৃষকরা বিশেষ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হবেন। এই জনপ্রতিনিধি মাঠ জরিপ করে প্রশাসনের অন্য কোন শাখাকে সরেজমিন প্রকৃত ক্ষয়-ক্ষতির চিত্র তোলে ধরার আহ্বান জানান।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জাহেদুল হক বলেন, দেখার হাওর, খরচার হাওর এবং শনির হাওরের সামান্য ক্ষতি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন হাওরের মোট ৩৩ হাজার হেক্টরের বোরো জমির ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি জানান। প্রকৃত ক্ষতির সঙ্গে কৃষি বিভাগের ক্ষতির প্রতিবেদনের বিরাট ফারাক রয়েছে জনপ্রতিনিধিদের এ অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, যার যা ইচ্ছে বলুক। এতে আমাদের কিছু আসে-যায় না। আমরা প্রকৃত অবস্থাই প্রতিবেদনে তুলে আনছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী