সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ০৮:১১ পূর্বাহ্ন

Notice :

আধিভাগা কৃষক মছদ্দর আলীর দীর্ঘশ্বাস

মো. আমিনুল ইসলাম ::
সদর উপজেলার দেখার হাওরপাড়ের রাবার বাড়ি গ্রামের আধিভাগা কৃষক মছদ্দর আলী এবার সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন। প্রখর রোদে দেখা গেলো অশীতিপর এই বৃদ্ধা পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে নেওয়া দেখার হাওরে বুক সমান পানিতে নেমে ডুবে যাওয়া আধা পাকা ধান কাটছেন। তাঁর মতো আশপাশের গ্রামের অনেক কৃষককেই দেখা গেল এভাবে শেষ চেষ্টা করতে। কিন্তু সেই চেষ্টা করেও তাঁরা সফল হতে পেরেছেন খুব কমই। যৎসামান্য যে ধান তোলতে পেরেছেন তা দিয়ে খোরাকিই হবেনা তাঁদের। বুধবার দুপুরে হাওরে এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় স্থানীয় কয়েকজন কৃষকের। তাঁরা সবাই ফসল তলিয়ে যাওয়ার ঘটনায় পাউবো, ঠিকাদার এবং পিআইসি’র সংশ্লিষ্টদের শাস্তি দাবি করেন। পাশাপাশি ফসলরক্ষায় টেকসই পদ্ধতি বের করার আহ্বান জানান।
কৃষক মছদ্দর আলী বলেন, ‘আমার বড়ো সুখের দিন আছিল। সংসারে আছিল কতো আনন্দ। কাম কইরা যখন বাড়িতে যাইতাম তখন আমার চার বাপজান (ছেলে) আমারে দরজা থাকি হাতের আঙুলে ধইরা ঘরে ঢুকাইতো। ওখনে আমার বাপজানেরা বড় হইসে। ৩ জনে তারার সংসার নিয়া ব্যস্ত। আমার কথা মনে নাই। আমি এক ছেলের কাছে থাকি। পরের জমিন আইধ্যা কইরা (অন্যের জমি চাষ করে) খাই। ক্ষেতে কাম করি আর বাঁইচ্যা থাকি। আমার তিন বাপজানেও জমিন করে, কিন্তু প্রায় প্রত্যেক বছরেই বান ভাইঙ্গা পানি আইয়া (এসে) সব ধান লইয়া যায়। আমরা খালি দেখি আর চোখের পানি ফালাই (ফেলি)। আমরার যে করার মতোও কিছু নাই। গরিব হইয়া জন্ম লইছি…। বাঁচার লাগি কাম কইরা রক্তরে পানি বানাই। এরপরে যখন সব কাম বিফলে যায় তখন পানিতে ঝাঁপ দিয়া মরণের বড় ইচ্ছা করে, কিন্তু পারি না। বুকটা ফাইট্টা কান্দন আয়। আমরার লাগি আসলে কেউ নাই। বড় বড় সাবেরা প্রত্যেক বছর হাওরের বান (বাঁধ) লইয়া বড় বড় কথা কইন। খালি শুনি বানের লাগি টেকা দেয় সরকারে। কিন্তু আমরা কৃষকরার জীবনে আজকে পর্যন্ত এই বান কোন কামে লাগে নাই। তাইলে বান কার লাগি? আসলেই কি এই টেকা সব আমরার লাগি আসে? পানি আয় আমরার কপাল ভাঙ্গে। নেতারা আর সরকারি অফিসাররা খালি মুখেই দরদ দেখায়। কামের কাম যদি কিছু হইতো তাইলে অন্তত আমরার এই দশা হইতো না।’
বৃদ্ধ মছদ্দর আলীর সঙ্গে কথা বলার সময় আরও কয়েকজন কৃষক এগিয়ে আসেন। থালা থেকে মুখে খাবার নিচ্ছিলেন তাঁরা। মছদ্দর আলীও ভাত খাচ্ছিলেন। মছদ্দর আলী থালা ধুয়ে চোখের জল ছেড়ে দিলেন। তাঁর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে গাল বেয়ে নামছিলো। তিনি হাউমাউ কেঁদে উঠলেন। বললেন ‘আল্লায় আমরারে দেখে না ভাই। আল্লায় আমরার দিকে চায় না। এইবার যে আমরার কপালে সুখ নাই। ভাত আর খাওয়া লাগবো না। আরেক বেটার (লোকের) জমিন চাষ দিয়া যা কিছু পাইবার আছিলো সবই পানিয়ে লইয়া গেছে। যে টেকা ঋণ কইরা আনছিলাম সব গেছে। আমরা ওখনে আল্লার দিকে চাইয়া আছি। আমরা কানলেও শোনবার মতো লোক নাই ভাই, আমরার ভাইগ্য লইয়া মাইনষে খেলে, আমরা খালি দেইখ্যা দেইখ্যাই দিন কাটাইলাম, বাকি দিনও কি এই লাখান যাইবো?’
মছদ্দর আলীর কান্না ছোঁয়ে গেল পাশে উপস্থিত কিষাণী জয়তারা খাতুনকেও। স্বামী মারা যাবার পর এই কিষাণী কৃষিকাজ করেই পরিবারের ভরণপোষণ করছেন। তিনিও অন্যের জমিতে চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। ক্ষোভের সঙ্গে এই কিষাণী বললেন, ‘দেড় কিয়ার জমিন বাগি আইন্যা আমি আজকে সবের চেয়ে বেশি কষ্টে আছি। আমি ৩ পোয়া জমিনের ধান পাইলামনে। এই ধান দিয়া আমি এতিম বেটি (মহিলা) কোন রকমে খাইয়া বাঁচলামনে। মাঠ ভরা ধান আছিল। অখন পানি আর পানি। ঘুম থাইক্যা উইঠ্যা আউর (হাওর) দেইখ্যা মাথা ঘুরাইয়া গেছিল। আমরার লাগি কি দেশে কেউ নাই? বান্দে (বাঁধে) মাটি ঠিকমতো দিলে যতো বছর হইসে তাতে বান্দের উপরে দিয়া গাড়ি চলার কথা। সরকারের টেকা মাইরা খাইয়া যারা বড়লোক হইসে তারার বিচার আল্লায় করবো। এই বছর আমরার গরুও না খাইয়া মরবো। খেড়ও (খড়) নাই, আমরার কান্দন ছাড়া উপায় নাই’।
রাবারবাড়ি এলাকার আরেক কৃষক সামছুদ্দিন অনেকটা উত্তেজিত হয়ে বললেন ‘বান্দের নামে টেকা আয় আর টেকার খেলা চলে। আমরা কৃষকরে দেখাইয়া নেতা আর অফিসাররার পেট ভরে। আমরার ভাইগ্য বদলায় না, কষ্ট দূর হয় না, আর কৃষি অফিসাররা কয় আমরা ক্ষতি অইছে কম। সবাই আমরার লগে প্রতারণা করে।
এই এলাকার কৃষকরা বলেন, হাওরের ফসলরক্ষার জন্য জরুরি ভিত্তিতে পরিবেশসম্মত স্থায়ী পদ্ধতি বের করতে হবে। না হলে হাওরের কৃষি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী কৃষিপেশা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাবে। এতে এক সময় পুরো দেশই বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। কৃষকরা এবার ফসলহানির ঘটনায় সরকারের কাছে বিশেষ সহযোগিতার আহ্বান জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী