শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১১:৪৪ অপরাহ্ন

Notice :

আজ বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস: ‘সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য ম্যালেরিয়া শেষ করুন’

ডা. ওমর ফারুক
২৫ এপ্রিল সারাবিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও ‘বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস’ পালিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) ২০০৭ সালের মে মাসে সংস্থাটির ৬০তম অধিবেশনে দিনটিকে বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস হিসেবে নির্ধারণ করে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য “সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য ম্যালেরিয়া শেষ করুন” (ঊহফ সধষধৎরধ ভড়ৎ মড়ড়ফ)। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ (৩২০ কোটি) ম্যালেরিয়া ঝুঁকিতে আছে। গত বছর বিশ্বের ৯৭টি দেশে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব ছিল এবং চার লক্ষ আটত্রিশ হাজার মানুষ ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুবরণ করে। বাংলাদেশের ১৩টি জেলার ৭২টি উপজেলায় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব সর্বাধিক। প্রতিবছর ম্যালেরিয়া রোগজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যু প্রায় শতকরা ৯৮ ভাগ সংঘটিত হয়ে থাকে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন এই ১৩টি জেলায়। জেলাগুলো হচ্ছে- রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোণা ও কুড়িগ্রাম। প্রাদুর্ভাবের মাত্রা অনুযায়ী জেলাগুলোকে আবার ৩টি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। যেমন- পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩টি জেলা উচ্চ ম্যালেরিয়াপ্রবণ; কক্সবাজার মধ্য ম্যালেরিয়া প্রবণ এবং বাকি ৯টি জেলা কম ম্যালেরিয়াপ্রবণ।
সিলেট বিভাগের ম্যালেরিয়া পরিস্থিতি :
সিলেট বিভাগের ৪টি জেলাতেই ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব আছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজার জেলার সবক’টি উপজেলা, সিলেট জেলার ৪টি উপজেলা (কোম্পানিগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, জৈন্তাপুর), হবিগঞ্জ জেলার ২টি উপজেলা (মাধবপুর, চুনারুঘাট) এবং সুনামগঞ্জ জেলার ৭টি উপজেলা (সুনামগঞ্জ সদর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, তাহিরপুর, ছাতক, দোয়ারাবাজার, ধর্মপাশা, বিশ্বম্ভরপুর) ম্যালেরিয়া প্রবণ। তবে আশেপাশের ও অন্যান্য উপজেলার মানুষও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। এখানে উল্লেখ্য যে, কম ঝুঁকিপূর্ণ ৯টি জেলার মধ্যে মৌলভীবাজার একমাত্র জেলা, যা সবক’টি উপজেলাই ম্যালেরিয়া প্রবণ এবং সর্বশেষ জুড়ি উপজেলা এর অন্তর্গত হয়েছে।
আশার কথা, ২০১৩ সালে সিলেট বিভাগে মোট ম্যালেরিয়া আক্রান্তের সংখ্যা ১,০৮০ হলেও ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫৯ জনে। ২০১৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা আরও কমে হয়েছিল ১৭৫। ২০১৬ সালে প্রথম ৩ মাস মাসভিত্তিক আক্রান্তের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে জানুয়ারি ১০, ফেব্রুয়ারি ১১ ও মার্চ ২, যা ক্রমবর্ধমান নি¤œমুখী ধারাকে নির্দেশ করে। এ সাফল্য বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এবং এর সহযোগী হিসেবে কর্মরত এনজিও সমূহের।
সিলেট বিভাগে ব্র্যাক-এর নেতৃত্বে যেসব এনজিও কাজ করে, এরা হলো- সীমান্তিক (কানাইঘাট), হীড বাংলাদেশ (জৈন্তাপুর), ভার্ড (গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, সুনামগঞ্জ সদর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, দোয়ারাবাজার, বড়লেখা), বন্ধন (ছাতক), বিডিএসসি (তাহিরপুর, রাজনগর), এফআইভিডিবি (বিশ্বম্ভরপুর), সাজিদা ফাউন্ডেশন (ধর্মপাশা), এসএসএস (মৌলভীবাজার সদর, কুলাউড়া, চুনারুঘাট, মাধবপুর) এবং ব্র্যাক স্বয়ং কাজ করে শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ ও জুড়ি উপজেলায়। সারাদেশে ব্র্যাক সহ ২১টি এনজিও’র সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়াম ২০০৭ সাল থেকে এ কাজ করে যাচ্ছে।
অর্থায়ন :
বাংলাদেশ জাতীয় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে শক্তিশালী ও সম্প্রসারিত করার জন্য গ্লোবাল ফান্ড টু ফাইট এইডস্, টিউবারকিউলোসিস এন্ড ম্যালেরিয়া (এঋঅঞগ) থেকে আর্থিক সহায়তা লাভ করেছে। এছাড়া এইচপিএনএসডিপি’র আওতায় যুক্তরাজ্য সরকারের সাহায্য সংস্থা ডিএফআইডি’র নেতৃত্বে যুক্তরাজ্যসহ মোট ৪টি দেশের দাতাসংস্থার সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়াম জয়েন্ট ডোনার টেকনিক্যাল এসিস্টেন্স ফান্ড (ঔউঞঅঋ) এ কাজকে আরো বেগবান করার জন্য ৩জন সার্ভিলেন্স মেডিকেল অফিসার পদায়নের ব্যবস্থা করেছে। তবে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সার্বিক সাফল্যের জন্য আরও ব্যাপক অর্থায়ন প্রয়োজন। এখানে উল্লেখ্য যে, বিশ্বব্যাপী ম্যালেরিয়া নির্মূলের জন্য যা অর্থ প্রয়োজন, বর্তমানে তার মাত্র অর্ধেকের যোগান আছে।
বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া রোগ নির্ণয় ও এর চিকিৎসা :
* বিনামূল্যে দ্রুত রোগ নির্ণয় পদ্ধতি বা জউঞ, যার মাধ্যমে মাত্র ২০মিনিট বা তারও কম সময়ে ম্যালেরিয়া রোগ নির্ণয় করা যায়।
* এছাড়া রক্ত কাচ পরীক্ষার মাধ্যমেও ম্যালেরিয়া রোগী শনাক্ত করা যায় এবং এটিও বিনামূল্যে।
* পূর্বে উল্লেখিত এনজিও সমূহের ল্যাবরেটরি, কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, এলাকার সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যকর্মী, জেলা সদর হাসপাতাল এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ উভয় প্রকার রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে।
* পরীক্ষায় ম্যালেরিয়া ধরা পড়লে প্রাথমিক পর্যায়ে মাত্র ৩দিন পূর্ণ মাত্রায় ঔষধ সেবন করলে ম্যালেরিয়া সম্পূর্ণ ভাল হয়। ওয়ান স্টপ সার্ভিস হিসেবে যেখানে বিনামূল্যে রক্ত পরীক্ষা করা হয়, সেখানেই বিনামূল্যে ঔষধও প্রদান করা হয় এবং রোগ ভাল হলো কি না কিংবা রোগী ঠিকমতো ঔষধ খাচ্ছে কি-না, তা এনজিও কর্মীরা রোগীর বাড়ি গিয়ে ফলোআপ করেন।
ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা যায় কিভাবে :
* ম্যালেরিয়া জীবাণুর বাহক নিয়ন্ত্রণ কমিউনিটি পর্যায়ে রোগটি প্রতিরোধের প্রধান উপায়।
* ব্যক্তি পর্যায়ে মশার কামড় থেকে নিজেকে সুরক্ষা করা। এজন্য বিতরণকৃত দীর্ঘস্থায়ী কীটনাশকযুক্ত মশারি প্রতিদিন সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টানানো। এখানে উল্লেখ্য যে, সিলেট বিভাগে ২০১৫ইং সনে দু’পর্যায়ে মোট ৬ লক্ষ ৫৯ হাজার ৫০০টি মশারি বিতরণ করা হয়েছে, যা শতকরা ৩৫ ভাগ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিয়েছে। আরো উল্লেখ্য যে, মধ্য ও উঁ”ু ঝুঁকিপূর্ণ ৪টি জেলার শতকরা ১০০ভাগ জনগোষ্ঠী এই মশারি সুরক্ষার আওতায় এসেছেন।
* রাতের বেলা বিশেষ করে ঘরের বাইরে গেলে হাত-পা ঢাকা থাকে, এমন কাপড় পরিধান করা।
* সম্ভব হলে শরীরের অনাবৃত অংশে মশা বিতাড়ক ক্রিম বা লোশন এবং ঘরের দরজা জানালায় নেট বা জাল ব্যবহার করা।
* মশা তাড়াবার ধোঁয়া যেমন- মশার কয়েল ইত্যাদি ব্যবহার করা।
* মশা ডিম পাড়ে ও বংশ বিস্তার ঘটায় এমন অপ্রয়োজনীয় ডোবা, গর্ত, নর্দমা ভরাট করে ফেলা।
* স্থায়ী আবদ্ধ জলাশয়ে শূককীট খেকো মাছ যেমন-তেলাপিয়া, গাপ্পি, নাইলোটিকা ইত্যাদি কার্প জাতীয় মাছ চাষ করা।
* সকল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় ৩য় থেকে ঊর্ধ্বশ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদেরকে তাদের পরিবার ও আশপাশের বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার জন্য ৩টি বার্তা শেখানো-
১. জ্বর হলে ম্যালেরিয়া হতে পারে।
২. ম্যালেরিয়া শনাক্ত করার জন্য বিনামূল্যে রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে।
৩. পরীক্ষায় ম্যালেরিয়া ধরা পড়লে বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে।
[লেখক: ডা. ওমর ফারুক : সার্ভিলেন্স মেডিকেল অফিসার-জাতীয় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, সিলেট বিভাগ, সিভিল সার্জন অফিস, সিলেট।]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী