শনিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২০, ০৭:৩৫ অপরাহ্ন

Notice :

একের পর এক ডুবছে হাওরের ফসল

স্টাফ রিপোর্টার ::
যে হাওরগুলো এখনো প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে আছে সেখানে নির্ঘুম অবস্থান করছেন উদ্বিগ্ন কৃষক। বাঁধরক্ষায় প্রাণান্তকর চেষ্টা করছেন তাঁরা। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্মিত নড়বড়ে বাঁধ ভেঙে একের পর এক ডুবছে হাওরের ফসল। সংগ্রামী কৃষক সোনার ফসল ধরে রাখতে পারছেন না। গতকাল মঙ্গলবারও জেলার তাহিরপুর, ধর্মপাশা এবং শাল্লার ছায়ার হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকেছে।
জানা গেছে, গত সোমবার রাতে জেলার অন্যতম বড় হাওর তাহিরপুরের শনির হাওরের জামালগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত নান্টুখালি বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করে। বাঁধটি নির্ধারিত সময়ে এবং প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় রাতে বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকতে থাকে। সকালেই প্রায় ৯৫ ভাগ ফসল নিয়ে ডুবে গেছে হাওরটি। গতকাল সরেজমিন বাঁধে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে সান্ত¡না জানিয়ে এসেছেন জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম। এসময় ক্ষুব্ধ কৃষকরা তাঁকে বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম বিষয়ে নানা কথা বলেন।
জানা গেছে, সোমবার দিনভর অভুক্ত উদ্বিগ্ন কৃষক স্বেচ্ছায় ঝালোখালি বাঁধে শনির হাওর রক্ষায় কাজ করেছেন। হাড়ভাঙা খাটুনি শেষেও কষ্টে ফলানো সোনার ফসল ধরে রাখতে পারেননি তাঁরা। তাঁদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তলিয়ে যায় তাহিরপুরের বোরোভান্ডার খ্যাত শনির হাওরটি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, শনির হাওরে প্রায় ৬হাজার ৬৩৮ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছিল। গত ৯ এপ্রিলের তুমুল শিলাবৃষ্টি এ হাওরের অর্ধেক ফসল ঝরিয়ে যায়। বাকি ফসল গত সোমবার রাতে বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে। এ হাওরে প্রায় ৭৯ কোটি টাকার ফসল উৎপাদন হওয়ার কথা ছিল। কৃষি অফিস জানিয়েছে ডুবে যাওয়ার আগে কৃষকরা এ হাওরের প্রায় ১০ ভাগ ধান কাটতে সক্ষম হয়েছেন।
এদিকে মঙ্গলবার বিকেলে শাল্লা উপজেলার জোয়ারিয়া বাঁধ ভেঙ্গে ছায়ার হাওরে চুইয়ে চুইয়ে পানি ঢুকছে বলে কৃষকরা জানান। এই বাঁধেও গতকাল স্বেচ্ছাশ্রমে কৃষকরা কাজ করেছেন। ছায়ার হাওর তলিয়ে গেলে প্রায় ৪হাজার ২৭০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে যাবে বলে কৃষকরা জানান। এদিকে ক’দিন আগে দিরাই উপজেলার বরাম হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকছিল। তবে কৃষক, জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের চেষ্টায় পানি আটকানো গেলেও বিভিন্ন স্থান দিয়ে পানি চুইয়ে চুইয়ে হাওরে পানি প্রবেশ করে নি¤œাঞ্চলের ধান তলিয়ে যায়। এর আগে জগন্নাথপুর উপজেলার মইয়ার হাওর এবং নলুয়ার হাওর শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতির পাশাপাশি বুরাখালি বাঁধ ভেঙ্গে ফসলহানির ঘটনা ঘটেছে। কৃষকরা বুরাখালি বাঁধ রক্ষায় প্রাণান্তকর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। এই দুই হাওরের প্রায় ১০হাজার হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে বলে কৃষকরা জানান। গত শনিবার সদর উপজেলার ঝাউয়ার হাওর তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ১হাজার হেক্টর জমির বোরোধান তলিয়ে গেছে। ধর্মপাশা উপজেলার পাথারিয়া, সাথারিয়া ও ডুবাইল হাওর বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে।
জানা গেছে, বাঁধভাঙ্গার খবর পেয়ে কৃষক ও জনপ্রতিনিধিরা ঘটনাস্থলে যেতে যেতেই বাঁধের ভাঙনস্থল ভেঙে ভেঙে বড় হয়ে যায়। একদিকে পানি আটকানোর চেষ্টা করলেও অন্যদিকে ভেঙে ফসলহানি ঘটাচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ পানি উন্নয়ন বোর্ড ডিসেম্বরে কাজ শুরু করে ফেব্রুয়ারিতে শেষ করতে পারলে বাঁধগুলো টেকসই হতো। কিন্তু তারা শেষ দিকে এসে বাঁধে মাটি ফেলায় বাঁধগুলো নড়বড়ে থাকে। ফলে পাহাড়ি ঢলের প্রথম চাপেই বাঁধগুলো ভেঙে হাওর তলিয়ে নেয়। এবার এই সমস্যায় হাওরের ফসলডুবি হচ্ছে বলে কৃষকদের অভিযোগ।
শনির হাওরপাড়ের বদরপুর গ্রামের কৃষক খোকন মিয়া বলেন, আমরা সোমবার সারাদিন বাঁধে কাজ করেও শেষ পর্যন্ত বাঁধটি রক্ষা করতে পারিনি। আমাদের চেষ্টা ব্যর্থ করে অবশেষে হাওরটি তলিয়ে গেছে। শনির হাওরের প্রায় ৯৫ ভাগ কৃষক এবার সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি জানান।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জাহেদুল হক বলেন, প্রতিটি হাওরই ঝুঁকিতে রয়েছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঁধভেঙে যে কোন সময় অবশিষ্ট হাওরের ফসল তলিয়ে যেতে পারে। এ পর্যন্ত শিলাবৃষ্টিতে প্রায় ১২হাজার হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাওয়া হাওরের ক্ষয়-ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী